বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
জুম পাহাড়ের অধিকার
পাহাড়ে কেন আগুন জ্বলছে?
প্রকাশ: ০৬:৫৭ pm ০৪-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০৬:৫৭ pm ০৪-০৬-২০১৭
 
 
 


ইলিরা দেওয়ান||

এক দশক ধরে জীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে বাস করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই এ শহরটা কখনো আমার মন জয় করতে পারেনি। আমার পুরো মনটাই পড়ে থাকে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে।
হ্যাঁ, এক দশকের নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কমন একটি বিষয় পাঠকদের সঙ্গে এখানে শেয়ার করতে চাই। পাহাড় থেকে যখন কেউ কাজে ঢাকায় আসেন, তখন তাঁর নাগরিক অবসরের সময়টুকু কাজে লাগানোর জন্য ঢাকা শহরের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দর্শনীয় স্থানের তালিকায় দুটি নাম সব সময় অগ্রাধিকার পায়, সেগুলো হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। এ দুটি জায়গায় কতবার যে গিয়েছি, মনে নেই। 
মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে থাকা যুদ্ধের ছবিগুলোতে যখন জীবন বাঁচানোর তাগিদে পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ দেখি, তখন কেবল সেসব ছবিতে নিজের শৈশবের মুখখানি খুঁজে পাই। একাত্তরের যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখিনি বটে, কিন্তু লাল-সবুজের পতাকার এ দেশে আমি জীবন বাঁচাতে সেই পালিয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কিছুদিন ধরে আমার মনে শৈশবের স্মৃতিগুলো বারবার কেন উঁকি দেয়, সেটা নিয়েই ভাবছিলাম। পরে অদ্ভুত কারণটাও আবিষ্কার করলাম! ঘুমের মধ্যে প্রায়ই আমি স্বপ্নে দেখতে পাই—খাগড়াছড়ির আলুটিলার পাদদেশে আমার সেই ছোট্ট গ্রামটি আক্রান্ত হচ্ছে! আমরা সবাই পালাচ্ছি! পালাতে পালাতে হঠাৎ মনে হলো ঘরে তালা তো দেওয়া হয়নি! তাই আবার ফিরে আসা! ঘরে তালা দেওয়ার পর দেখা গেল ভেতর থেকে রান্নাঘরের দরজা আটকানোই হয়নি! সেটি উদাম হয়ে আছে! শেষে ওই অবস্থায় ঘর ছেড়ে খোলা মাঠের মাঝখান দিয়ে শত শত মানুষ দৌড়াচ্ছি! কিন্তু কোথায় যাচ্ছি জানি না! ঘুম ভেঙে গেলে ঘামে ভেজা শরীরটাকে যখন ছাদের নিচে নিরাপদ (!) আশ্রয়ে আবিষ্কার করি, তখন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি! তাহলে এতক্ষণ যা ঘটছিল তা স্বপ্ন, বাস্তব নয়! কিন্তু আমি তো জানি, এ ঘটনাগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে কোমলময় সময়ের দুঃসহ স্মৃতি!

দুই
দুদিন আগে লংগদুতে পাহাড়িদের ওপর যা ঘটে গেল, তা এই দুঃস্বপ্নেরই বাস্তবরূপ। ফেসবুকে একজনের মন্তব্য দেখলাম—৭১ বনাম ১৭! একাত্তরের পাকিস্তানি ভূতের প্রেতাত্মা কি এখনো এ দেশ বয়ে বেড়াচ্ছে? নইলে পাহাড় কেন বারবার আক্রান্ত হবে! বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—কোনোটাই এই জাত্যভিমানী জাতিকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি! নইলে এ জাতি কীভাবে এ দেশের বহু সংস্কৃতি, বহু জাতিসত্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে! কথায় কথায় বাঙালিত্বের গর্বে বুক ফুলিয়ে বাঙালিত্ব জাহিরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে! গণতন্ত্রের ফোয়ারায় আজ দেশীয় সংখ্যালঘুরা অল্প তেলে মচমচে ভাজা হয়ে যাচ্ছে!
লংগদুর পাহাড়িরা এবারই প্রথম নিঃস্ব হয়নি। ’৮৯ সালের ৪ মে আরেকবার নিঃস্ব হয়েছিল। সে সময় নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৪০ জন পাহাড়িকে হত্যার পর বৌদ্ধমন্দিরসহ গ্রামে গ্রামে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই। মাত্র মাসখানেক আগে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কলেজছাত্র রমেল চাকমাকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। রমেলের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের তার লাশটিও ধর্মীয় রীতিতে সৎকার করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। যে রাষ্ট্র অন্যকে স্বীকার করে না, অন্যের ধর্মবিশ্বাসকে অসম্মান করে, অন্যের মতের মূল্যায়ন করে না, সে রাষ্ট্র কীভাবে উন্নত হয়! দুর্ভাগ্য আমাদেরই! আমরা যারা এত বৈষম্য, বঞ্চনা, অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার পরও এ দেশের লাল-সবুজের পতাকাকে আঁকড়ে ধরে এ মাটির বুকে টিকে থাকতে চাই! স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই! রমেলের মতো লংগদুর ৭০ বছরের বৃদ্ধ গুণবালা চাকমাও স্বাভাবিক মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সুযোগ পাননি। আগুনের লেলিহান শিখায় ঝলসে গেছে তাঁর শরীর। অনুরূপভাবে স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগ পাননি দীঘিনালার বড়াদমের ৭০ বছরের বড় দাস মুনি চাকমা, বাঘাইহাট গুচ্ছগ্রামের বুদ্ধপুদি চাকমা, পানখাইয়া পাড়ার তরুণ ক্যজাই মারমা, মহালছড়ির নিতীশ চাকমাসহ অনেকে। কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যান স্কুলছাত্র রূপন চাকমা, মনতোষ চাকমা, সুকেশ চাকমারা।
লংগদুর ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার একাধিক ছবি অনলাইনে ঘুরছে। তার মধ্যে একটি ছবিতে দেখা যায় আতঙ্কিত এক নারীর মুখ! তাঁকেই সবার আগে দেখা যাচ্ছে। পেছনে আরও অনেক লোক। তারও পেছনে তাদের ফেলে আসা ঘরবাড়িগুলো থেকে ততক্ষণে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে! তাদের সামনের যাত্রা যেমন অনিশ্চিত, তেমনি পেছনে ফেরার শেষ আশ্রয়স্থলও ততক্ষণে ছাইস্তূপে পরিণত হয়েছে! এ মানুষগুলো আর কত পালাবে! আর কতটা মানসিক, শারীরিক, বৈষয়িকভাবে নিঃস্ব হলে পরে রাষ্ট্রের মনে এ বোধ জাগবে—নাহ্, এ মানুষগুলোর ওপর অন্যায় করা হচ্ছে!
পার্বত্য চুক্তির দুই দশক হতে চলল। কুড়ি বছর ধরে এ চুক্তিকে ‘মুলা ঝুলা’ দিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝেমধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলে গা ঝাড়া দেওয়া হয়! শাবাশ বাংলাদেশ! এভাবেই তো বাংলার জয়গান আমাদের গেয়ে যেতে হবে!
লেখাটি শুরু করেছিলাম আমার শৈশবে প্রাণভয়ে পালানোর স্মৃতি রোমন্থন করে! আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের স্মৃতি, যখন আমি ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়তাম! সাড়ে তিন দশক পর আমার সন্তান আবারও সেই পালানোর অভিজ্ঞতা দিয়ে তার জীবনসংগ্রামের পথচলা শুরু করল! বাহ্! মা হিসেবে তো এ আমার পরম সৌভাগ্য!
কিন্তু না, আমি আমার সন্তানকে পালানো শেখাব না। তাকে আমি প্রতিরোধের মন্ত্রে দীক্ষিত করব।
ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
ilira.dewan@gmail.com

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71