রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান, কি জাতি গত দায় নয়?
প্রকাশ: ০৩:০৫ am ১৭-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০৩:০৫ am ১৭-০৬-২০১৫
 
 
 


নূরিতা নূসরাত খন্দকার:
এখন খবরগুলো কিছুটা ডিসপ্লে গ্রাউন্ডে দৃশ্য বদলের সাথে সাথে পোশাক বদলের মত দ্রুত পাল্টে যায়। তাই আমার আলোচ্য বিষয়টি এ যুগের খবরকর্তা এবং পাঠকের কাছে পুরাতন মনে হতে পারে। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে পুরাতন ম্লান খবরের নিগুঢ়কে গুরুত্বের সাথে রোমন্থন করে ভবিষ্যতকে স্বচ্ছভাবে দেখার চেষ্টা করতেই পারে যে কেউ। এই লেখাটির উৎসস্থল সেই চিন্তার আধারেই।
গত শনিবার ১৩ জুন, সিটি সার্ভিস বাসে একটি ২টাকা দামী খবরের কাগজ কিনেছিলাম। কাগজের শেষ পৃষ্ঠায় মাননীয় সমাজকল্যানমন্ত্রীকে নিয়ে একটা বেশ গোলযোগপূর্ণ খবর দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠলাম। আঁতকে ওঠার কারনও ছিল। খবরটি এমন ভাবে সাজানো, মন্ত্রী তাঁর এলাকার এডিসিকে থাপ্পড় মেরেছিলেন। সেই এডিসি'র অপরাধ - তিনি মাননীয় মন্ত্রীর নাম বলার সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্বোধন করেননি। এই মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে দুটি কথা বলে নিচ্ছি, যে কথাগুলো ঠিক সন্ধ্যাকালের প্রদীপের জন্য সকাল বেলায় সলতে পাকানো প্রস্তুতির মত।


আমরা খুব হতভাগা জাতি- এমন বাক্য টিভির পর্দায় যেমন টক-শো নামের ঝাল-তিতা কথার অনুষ্ঠানগুলোতে শুনতে পাই, তেমনি শিল্প-সংস্কৃতি-রাজনীতি আড্ডা আলোচনাতেও শুনতে পাই। আসলে আমরা হতভাগ্য কোথায়? আমার জ্ঞান খুব সীমিত। শুধু এতটুকুই বলব- আমরা নিজেরদের সম্মান দিতে পারিনা; হয়তো আমরা নিজেরাই আমাদের সে শিক্ষা দেইনি। মাননীয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মানুষকে সম্মান করেন সে কথা নতুন করে বলবার কিছু নেই। এই অংশে রেডটাইমসবিডি অনলাইন নিউজ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর প্রোফাইল শিরোনামে উক্ত কাগজের সম্পাদকের লেখা একটি প্রতিবেদনের কিছুটা তুলে ধরছি- ''২০০১ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের নিয়ে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে বসেছিলেন। তখনই একজন তৃণমূলের নেতা বলেছিলেন আমাদের এই পরাজয়ের প্রধান কারণ মন্ত্রীমহোদয়েরা। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা তাদের কাছে ভিড়তে পারিনি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার কারণেই আমাদের এই পরাজয়। এ কথাটি সেদিন দিনের উক্তি হিসেবে দৈনিক প্রথম আলোয় ১ম পাতায় ছাপা হয়েছিল। যিনি এই উক্তি করেছিলেন তিনি সৈয়দ মহসিন আলী। বর্তমানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তখন ছিলেন মৌলভীবাজার পৌরসভায় পরপর ৩ বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই নির্বাচনে সিলেট সদর আসনে সাইফুর রহমানকে পরাজিত করেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। পুরস্কার হিসেবে তিনি অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ করেন। কিন্তু সৈয়দ মহসিন আলী সেবার কোন মন্ত্রীত্ব পাননি। বরং কিছু কারসাজির কারণে তার স্থান হয় জাতীয় সংসদে পেছনের সারিতে। স্থানীয় একজন নেতার কূটচালের কারণে তিনি উপেক্ষিত হন সবখানে। স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে উপেক্ষা প্রদর্শন করে। কিন্তু তিনি ধৈর্য্য ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে আবার বিজয়ী হবার পর তাকে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তৃণমূলের এই নেতা সম্মানিত হন তাঁর কাজের জন্য।''
এবার ফিরছি আমার লেখার মোদ্দা কথায়, খবরটি বিভিন্ন কাগজে ছাপানো হয়েছে বলে ২টাকা মূল্যের সেই বিশেষ কাগজটির নাম নেয়া অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছি। প্রশ্ন আসতে পারে আমি কেন এই বিষয়ে লিখছি? খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন। উত্তরে বলব আমি এই স্বাধীন দেশের মাস্টার্স পাশ করা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত একজন শিক্ষিত নাগরিক। যে কোন অরাজক পরিস্থিতিতে আর কিছু না পারি কলম-অস্ত্র তুলে নেয়ার অধিকার আমার আছে। তার উপর বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী'র সামনে বসে তাঁর ১৯৭১ সালের স্মৃতি কথা শুনেছি। সেই স্মৃতিকথার নির্যাসে 'লালপাঞ্জাবী পরা সবুজ মানুষ' শিরোনামে পূর্বেই আমার একটি লেখা রেডটাইমসবিডি অনলাইন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সেই লেখার সূত্রে এই মানুষটিকে ঘিরে সিগারেট এবং বদনামের ধোয়াময় জালগুলো সরিয়ে সরিয়ে স্বচ্ছ করে দেখার সামান্য সুযোগ হয়েছে। তিনি সাহিত্য-সংগীত রসিক ব্যাক্তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে খেপে ওঠেন খুব দ্রুত আবার মেধার সুনাম গাইতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। তাঁর সে গুণ আছে। কাছে থেকে দেখার সুযোগে এই মন্ত্রীর অফিসের অনুজদের প্রতিও তাঁর সহমর্মিতার আঁচ পেয়েছি।
খবরের কাগজে যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর আচরণ নিয়ে তাতে আমি বিস্মিত! তিনি কি সেই সৈয়দ মহসিন আলী যাকে আমি চিনেছি ৩৪ নম্বর মিন্টু রোডের বাড়িতে সংগীত কাব্য আড্ডায়? কিম্বা ঢাকা ক্লাবের সিনহা লাউঞ্জে! কোন মিল পেলাম না। ঠিক তেমনি মিল পেলাম না খবর কর্তাদের আবোলতাবোল সংবাদের বাক্য বিভ্রান্তিতে। কেউ কি পিঠে থাপ্পড় মারে? থাপ্পড় মারে গালে- এতদিন আমরা তাই জানতাম। খবরের গর্ভে ছিল মন্ত্রী এডিসি'কে পিঠে থাপ্পড় মেরেছিল। হায় কান্ড! ঐ কাগজেই সাংবাদিকদের জবাবে মন্ত্রী মহোদয়ের উত্তর কিছুটা এমন ছিল, আদর করে পিঠে হাত চাপরেছিলাম। যারা ভালো কাজ করবে তাদের আদর করব।
খবরের ভোল গেল পাল্টে! কোথায় চাপর আর কোথায় থাপ্পড় আর কোথায় বা আদর? এই সব ২ টাকা দামের খবরের শব্দ বিন্যাসে শিরোনামেরও ভোল পাল্টে যায়। কারণ শিরোনাম ছিল কিছুটা এমন গোছের- এবার বীরমুক্তিযোদ্ধা অভিহিত না করায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এডিসি'কে থাপ্পড় মারলেন।
যদি তিনি থাপ্পড় মেরেও থাকেন তবে অন্যায় করেছেন বলব। সামাজের চোখের সামনে কারো গায়ে হাত তোলা ঠিক না বেঠিক তা যদি একজন মন্ত্রী না জেনে থাকেন তাহলে সেখানে সমাজ কি আশা করবে তাঁর কাছে? আবার পাশাপাশি সমাজকে এটাও জানা উচিত, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যদি সমাজের সামনে ওইটুকু পদবী দিয়ে সম্মান না দিতে পারি তবে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে কোন প্রজন্ম জন্মালাম যে বীরকে বীর বলতে ভুলে যাই কিম্বা ভুল করি? মুক্তিযোদ্ধারা যারা জীবিত আছেন তাঁরা আর কত বছরইবা দেহ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবেন? আর কয় প্রজন্মই'বা স্বচক্ষে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেখার সৌভাগ্য পাবে? তাঁরা তো ঝাড় জঙ্গলে সাপ ব্যাঙের সাথে দুর্গম রাত কাটিয়ে পাকিস্তানী হায়না আর দেশি রাজাকারদের সাথে লড়েই একটা স্বাধীন সূর্য আমাদের জন্য এনে দিয়েছেন। যার আলোতে আমরা পথ চলতে পারছি, আনন্দে গান গাইতে পারছি, ইচ্ছে মত কবিতা লিখেই যাচ্ছি। তাঁরা আমাদের জন্য দুঃসময় নিংড়ে সুসময় এনে দিয়েছন। আর আমরা তাঁদের জন্য ঐ সামান্য খেতাবি সম্মানটুকুও সমাজের সামনে তুলে ধরব না কেন? একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিয়ে আহ্বান করা কি আমাদের জাতি গত দায় নয়? তবে কি আমরা সত্যি খুব হতভাগ্য জাতির খেতাব নিয়ে আজীবন পার করব!
লেখিকা : সাস্কৃতিক কর্মী
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71