বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশ্ব স্বীকৃতি এল যেভাবে
প্রকাশ: ১১:৩৩ pm ১৪-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৩৩ pm ১৪-০৪-২০১৭
 
 
 


জাতীয়:: পয়লা বৈশাখে চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা। জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো গত বছরের ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউনেসকোর স্বীকৃতি লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ বছর সারা দেশেই বৈশাখী উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীদের নিজস্ব প্রয়াসে এ শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বিশ্বের ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতিকে করে তুলেছে ঋদ্ধ।

যেভাবে শুরু হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিল্পী আবুল বারক আলভী বলেন, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিত হয়ে আসছে। তবে ১৯৮৫ সালে যশোরে এটি প্রথম বের হয়, সেখানেও চারুকলার শিক্ষার্থীরা এতে জড়িত ছিলেন। 

চারুকলা অনুষদের ডিন ও শোভাযাত্রা শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা নিসার হোসেন ১৯৮৯ সালেই এখানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি জানান, ১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা। তিনি জানান, এরা ১৯৮৮ সালের বন্যায় কিছু কাজ করেছিল। সেই সময় তাদের চারুশিল্পী সংসদ সহায়তা করেছিল। শিক্ষকেরা পেছনে ছিলেন, কিন্তু সব কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। 
শুরুর সেই ঘটনার স্মৃতিচারণা করছিলেন নিসার হোসেন, ‘ওই সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ওই সময় সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সবার প্রচেষ্টায় তখন এটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হলো। সেখানে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেল। একটি হচ্ছে, আমাদের যে ঐতিহ্য আছে, সেটি তুলে ধরা। যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, একই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থাকার কারণে সেটি একটি ভিন্ন মাত্রা পেল।’
চারুকলার এ শোভাযাত্রাকে শোভিত করার জন্য যে উপাদানগুলো লাগে, সেগুলো শুরু থেকেই নেওয়া হয় দেশের লোকশিল্পের নানা ধরনের খেলনা থেকে। এর বাইরে ঘোড়া, নকশিপাখা, ফুল, প্রজাপতি, মানুষ, প্রকৃতি এগুলো শোভাযাত্রায় স্থান পেতে থাকে। নিসার হোসেনের মতে, ইউনেসকোর স্বীকৃতি দেওয়ার মূল কারণ যে এটা শুধু একটা সম্প্রদায়বিশেষের না, এটা গোটা দেশের মানুষের, সারা পৃথিবীর মানুষের। এখানে মানবতার বিরাট একটা ব্যাপার আছে।

ইউনেসকোর স্বীকৃতি 
ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মূল্যায়ন করেছে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের মানুষের সাহসী সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। ধর্মবর্ণজাতিলিঙ্গ-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের একই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও ইউনেসকোর এই স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। ইউনেসকো ২০০৩ সালে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’, অর্থাৎ মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন করে। এর আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো ঐতিহ্যবাহী মনোগত সাংস্কৃতিক উপাদান বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা জাতিগোষ্ঠীর ভেতরেই রয়েছে। চুক্তিতে সই করা দেশগুলো ইউনেসকোর স্বীকৃতির জন্য আবেদন করলে সংস্থাটি যাচাই-বাছাই করে সেই বিষয়গুলো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। ইউনেসকোর এ স্বীকৃতির ফলে ওই সাংস্কৃতিক উপাদান ওই দেশের নিজস্ব বলে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এই স্বীকৃতির ফলে মেনে নেওয়া হয়, ওই বিশেষ সাংস্কৃতিক উপাদানের জন্মস্থান হলো নির্দিষ্ট দেশটি।

নিয়ম অনুসারে, চুক্তিতে সই করা দেশগুলো প্রতিবছর একটি সাংস্কৃতিক উপাদানের স্বীকৃতির জন্য ইউনেসকোর কাছে আবেদন করতে পারে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্বীকৃতি চেয়ে ইউনেসকোতে আবেদন করে। স্বীকৃতি দেওয়ার মূল কাজটি করে ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’। কয়েক ধাপ পর্যালোচনার পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত কমিটির একাদশ সম্মেলনে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্বের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান হিসেবে অভিষিক্ত হলো।

শোভাযাত্রা হয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া
মঙ্গল শোভাযাত্রার আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এটি আয়োজন করার ক্ষেত্রে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হয় না। নিসার হোসেন বলেন, ‘চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীদের অনেকে তাঁদের চিত্রকর্ম বিক্রি করে যে অর্থ পান, তা-ই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনের মূল উৎস। সবার অর্থে এটা হচ্ছে, কারও একক অর্থে হচ্ছে না। ইউনেসকো আমাদের যেসব বিষয় উৎসাহিত করেছ, তার মধ্যে এটিও একটি যে আমরা কারও একক অনুদান নিয়ে এই অনুষ্ঠান করি না।’ 

আগে শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মুখোশ বা নানা উপকরণ নিলামে তোলা হতো। সেখান থেকে যে অর্থ পাওয়া যেত, তা পরবর্তী সময়ে শোভাযাত্রায় খরচ করা হতো। নিসার হোসেন বলেন, ‘পরে ভাবা হলো যে আমরা যদি এই কাজ এক মাস আগে থেকেই শুরু করি, তাহলে কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়। সেই থেকে এক মাস আগেই শিল্পকর্ম বিক্রি শুরু। এখনো তা চলছে।’ 

এ বিষয়ে আবুল বারক আলভী জানালেন, আমরা চেয়েছি আমাদের শিক্ষার্থীরা এতে যুক্ত থাক। এটা তাদের নিজস্ব। তাই এখানে বাণিজ্যিক কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে হয়তো আরও জাঁকজমক করা যেত শোভাযাত্রা। কিন্তু তখন সেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যানার, নাম বেশি প্রকাশ পেত, তখন আর মূল বিষয়টি মানুষ বুঝত না যে এটা চারুকলার নিজস্ব অনুষ্ঠান। তাই শিক্ষার্থীদের পারিশ্রমিক থেকেই এর অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবি: সাজিদ হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক অনেক বছর ধরেই মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান ঠিক করে দেন। তিনি বলেন, ‘কবে শুরু করেছি তা এখন মনে করতে পারছি না। এবার এই শোভাযাত্রার স্লোগান ঠিক করা হয়েছে “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর”।’ 

সত্য ও সুন্দরের প্রত্যাশায় সেই শোভাযাত্রাকে নিয়ে তুমুল প্রস্তুতি চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে। গত বুধবার সেখানে গিয়ে চোখে পড়ল রং মাখানো তুলির নাড়াচাড়ায় ব্যস্ত বেশ কিছু হাত। আঁচড় পড়ছে মুখোশে, সরায়। কারও হাতে তৈরি হচ্ছে বাঘ, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, পাখি, মুরগি, দুই মাথাওয়ালা হাঁস কত-কী! শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কাজে হাত লাগাতে এসেছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। কেউ কেউ সরা, মুখোশ, চিত্রকর্মসহ কিছু কিছু শিল্পকর্ম বিক্রি করছিলেন। এই শোভাযাত্রার খরচ আসে শিল্পকর্ম বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থে। চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হামিদ ভুঁইয়া নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি জানালেন ১৯ মার্চ থেকে তাঁরা মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কিছু কিছু শিল্পকর্ম শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত হবে। আর কিছু কিছু চিত্রকর্ম বিক্রি করা হচ্ছে। সেখান থেকেই আসবে শোভাযাত্রা আয়োজনের খরচ। 

প্রাচ্য কলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারিয়া মিমও বিভিন্ন উপকরণে রং করছিলেন। জানালেন, তিনি যখন এখানে পড়তেন না তখনো এগুলো তৈরির কাজ দেখতে আসতেন। এবার নিজেই করছেন সেই কাজ। বললেন, ‘এবার নিজেই করছি নিজের ভালো লাগার কাজটি। বড়দেরও উৎসাহ পাচ্ছি। তাই অনেক আনন্দ লাগছে।’

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71