সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
মার্কিন মুল্লুকে মটরগাড়ি ডিজাইনে বাংলাদেশীদের সাফল্য
প্রকাশ: ০৬:৪৪ am ৩০-০৩-২০১৫ হালনাগাদ: ০৬:৪৪ am ৩০-০৩-২০১৫
 
 
 


মেধা এবং কর্মনিষ্ঠার গুণে মটরগাড়ি প্রস্তুত কারাখানাতেও বাঙালিরা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছেন। শুধু তাই নয়, সময়ের প্রয়োজনে নতুন ডিজাইনের গাড়ি তৈরীর কাজেও বাঙালি প্রকৌশলীরা আমেরিকানদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। খবর এনআরবি।
অর্থাৎ বহুজাতিক এই দেশে নিজ নিজ কর্মস্থলে ভিনদেশী সহকর্মী-গবেষক-প্রকৌশলীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশীরা নিজেদের অবস্থান ক্রমান্বয়ে সুসংহত করছেন। খবর এনআরবি।
আমেরিকায় মটর সিটি হিসেবে পরিচিত মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট এবং এর আশপাশে এ পেশায় রয়েছেন অনেক বাংলাদেশী। তারা পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে নিজের ভবিষ্যত উজ্বল করছেন এবং একইসাথে বাংলাদেশের সুনাম বাড়াচ্ছেন।
ক্রিস্টফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে। এরপর পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় এখন অতীত। এই দীর্ঘ সময়ে আমেরিকার স্থলভূমিতে বসবাস করে আসছে বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশ থেকে আসা অভিবাসী, যারা সময়ের পরিবর্তনে এখন আমেরিকান । যতদূর জানা যায়, প্রথম ইমিগ্র্যান্ট হিসাবে মার্কিন মুল্লুকে বাঙ্গালীর আগমন ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে চা চাষের ক্রীতদাস হিসাবে। সেই ক্রীতদাসদের আনা হয়েছিল আসাম এবং চট্রগ্রাম থেকে।
এত আগে আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশীদের পদযাত্রা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত মার্কিন মুল্লুকে বাংলাদেশীদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, উকিপিডিয়ার হিসাব মতে মাত্র পাঁচ লাখ (বাস্তবে এর দ্বিগুণ বলে কম্যুনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলোর ধারণা)। সংখ্যার হিসাবে অনেক না হলেও এই দেশে বাংলাদেশীদের অনেকেই আলাদাভাবে চিনেন বিভিন্ন মৌলিক কারণে। বিশ্বখ্যাত স্থপতি বাংলার গর্ব ফজলুর রহমান খান এর কীর্তি কথা এবং তার নকশায় বানানো শিকাগোর গগণ চুম্বী ভবন সিয়ার্স (বর্তমানে উইলস টাওয়ার) টাওয়ার আমেরিকার অনেক গর্বের এক উল্লেখযোগ্য পর্ব। ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সততার উদাহরণ এই দেশে বসবাসরত কেবল বাংলাদেশীদের মুখেই নয়, সাদা চামড়ার অনেক ককেসিয়ানরাও বলাবলি করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমনিভাবে হয়তোবা কেউ কখনও শুনেনি কিংবা শোনার পটভুমি তৈরি হয়নি বাংলাদেশী গাড়ী প্রকৌশলীদের কীর্তিতে গাঁথা কাব্য গ্রন্থের কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যকে বলা হয় মটরগাড়ির রাজধানী। এ অঙ্গরাজ্যের বড় একটি শহরের নাম ডেট্রয়েট, যার চারপাশে বিশ্বের বড়বড় গাড়ি কারিগরদের প্রকৌশলকেন্দ্র। এখানে রয়েছে জেনারেল মটর, ফোর্ড মটর, ফিয়াট মটর, ক্রাইসলার গাড়ি কোম্পানির সদর দপ্তর । রয়েছে টয়োটা, এবং নিশান এর মত জাপানি, কোরিয়ান হুন্দাই-কিয়া কোম্পানিগুলোর প্রকৌশল শাখা। আনন্দের সাথে বলতেই হয় প্রতিটি কোম্পানিতেই কর্মরত আছেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। গর্বের সাথে বলাই যায় যে, উত্তর আমেরিকায় প্রস্তুত প্রতিটি গাড়িতেই রয়েছে বাঙালির কারিগরি হাতের ছাপ।
বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ারদের মেধায় জেনারেল মটরের লেটেস্ট ডিজাইনের গাড়ি-যা এখন বাজারে
গাড়ি আর গাড়ির কারিগর নিয়ে এ ফিচার স্টোরিতে গাড়ির কারুকাজে ভরা দুটো সিনেমার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে । “ ট্রান্সফরমার” ছবিতে বাম্বল বি‘র হঠাৎ করে নতুন মডেলের ক্যামেরোতে রূপান্তরিত হওয়া সিনেমা পাগল দর্শকদের কাছে অতি পরিচিত একটা দৃশ্য । আর অপরটি হলো “ দি ম্যাট্রিক্স রি লোডেড” । এই ছবিতে বৃহৎ আকারের গাড়ি ক্যাডিলাক এসক্যালেড এর খোলা ছাদ থেকে গুলি বিনিময়ের দৃশ্যও সিনেমা পাগল দর্শকদের সহজে ভুলবার কথা না । সিনেমা কিংবা ছায়াছবি যার বদৌলতেই হোক না কেন , ক্যামেরো আর ক্যাডিলাক এসক্যালেড, কেবল মার্কিন মুল্লুকেই নয়, সারা বিশ্বে গাড়ির গুণগত মানের বিচারে খুবই জনপ্রিয় । কিন্তু যেই বিষয়টা আমরা অনেকেই জানি না, তা হলো ক্যামেরো গাড়ির চ্যসিস (বাহ্যিক কাঠামো) আর সাস্পেন্সান এর লিড প্রকৌশলী হচ্ছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফেরদৌস গাজী। আর ২০১৫ ক্যাডিলাক এসক্যালেড যখন টেক্সাস এর আরলিংটনের ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে আসে, তার আগে ওই গাড়ির ইন্টেরিয়রের ফিট এবং ফিনিসকে সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত করতে সর্বাঙ্গীণ দায়িত্বে ছিলেন আরেক বাংলাদেশী প্রকৌশলী ডিএম রুহুল আলম । একইভাবে ‘নীড ফর স্পীড’ খ্যাত মাস্তাং এর স্টেয়ারিং হুইল এর প্রকৌশলী ইসহাক জামান।
ফেসবুকে ইঞ্জিনিয়ার রাহাতের একটা স্ট্যাটাসে লেখা, “বলেন তো, এই গাড়ির শিফটার তৈরিতে কার কারিগরি?” নিচে নতুন সুপার কার “ফোর্ড জিটি” এর ছবি। এ যেন এক বড় গর্বের সংবাদ।
ফেসবুকের আর এক জায়গায় জেনারেল মটর কোম্পানির বিদ্যুৎ চালিত গাড়ী “ভল্ট” এর নির্মাণ ভিডিও শেয়ার করে ইঞ্জিনিয়ার জাফরি লিখেছেন “আমার ভল্ট”। তিনি ঐ গাড়ী ইনভারটার সিস্টেমের লিড প্রকৌশলী। জেনারেল মটর কোম্পানির আর একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য গাড়ি (এই গাড়িটার বডি   পুরোটাই এলুমিনিয়ামের ) হল ক্যাডিলাক সিটি-৬, যার সিট ইঞ্জিনিয়ারিং এর দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশী প্রকৌশলী সাইফুল। এভাবে এক এক করে বলতে থাকলে সামনে আসতে থাকবে অসংখ্য গাড়ির নাম, আর তার সাথে জড়িত থাকা অসংখ্য বাংলাদেশী প্রকৌশলীর নাম, যারা নামের পিছনে না ছুটে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন চুপিসারে ।
গাড়ী নিয়ে গবেষণা, ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট ও বাণিজ্যিক নির্মাণের প্রতিটি ধাপেই আজ বাংলা হাতের কারিগরি। অতি অল্প দিনের মাঝেই বাংলাদেশী প্রকৌশলীগণ নিজ নিজ শাখার হয়েছেন লিড প্রকৌশলী, ম্যানেজার বা প্রধান প্রকৌশলী। গাড়ির ইঞ্জিন, ফুয়েল সিস্টেম, ব্রেক সিস্টেম, থার্মাল সিস্টেম, গ্লাস, আয়না, বাহ্যিক বডী, ইনটেরিয়র সিস্টেম, সিট সিস্টেম, সেফটি সিস্টেম, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সব জায়গাতেই বাঙালিদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত।
গাড়ী নির্মাণ কোম্পানি ছাড়াও গাড়ী নির্মাণ পার্টস সাপ্লাইয়ের কোম্পানিগুলোতেও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রকৌশলীদের উপস্থিতিও উল্লেখ করার মত।
শুধু প্রকৌশলী নন, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও গাড়ী নির্মাণ শ্রমিকদের একটি অংশও বাংলাদেশি। তাদের উপস্থিতি ও সাফল্য অনস্বীকার্য। তাদের সন্তানরা আজ ডাক্তার ও প্রকৌশলী।
কর্মক্ষেত্রে গাড়ী প্রকৌশলীদের হাজারো ব্যস্ততা থাকলেও বাংলাদেশী আড্ডায় কিন্তু সবার সরব উপস্থিতি। প্রকৌশলীদের রয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিস দল। আর এসব দলে খেলার প্রধান শর্ত বাংলায় কথা বলতে হবে। তাই দলে বাংলাদেশী ছাড়া আর কারও সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর খেলা মানেই মাঠে পুরো পরিবারের উপস্থিতি, যেন পারিবারিক মিলন মেলা। বার্ষিক বনভোজন হয় সত্যিকারের বনে। সব কিছু মিলে এ যেন বইতে পড়া আদর্শ জনতার প্রতিদিনের কর্মলিপি আর বাস্তবে সেটা ঠিক ঠিক ঘটে যাবার মতন অপূর্ব ঘটনা। এসব পারিবারিক আয়োজনে সুযোগ হলেই হাজারো হাসি কৌতুকের মাঝে অতি প্রচলিত কৌতুক হল “তোমাদের কোম্পানির এই গাড়ীটা এতটা ভালো না ভাই– এর হর্স পাওয়ার এত কম কেন–?’’ ইত্যাদি রচিত হয় উৎসাহ আর উপদেশের মহা-উৎসব ।
বিশাল এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা পেশাগতভাবে ব্যস্ত সময় কাটালেও সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিজেদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারেও মনোযোগ দিয়েছেন। মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের সরব উপস্থিতির জানান দিতে গঠন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশী আমেরিকান ডেমক্র্যাটিক ককাস’।   মিশিগানে ডেমক্র্যাটিক দলের এটি একটি সহযোগী সংঘ, যার বর্তমান চেয়ারম্যান হলেন প্রকৌশলী শাহিন। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে এই ককাসের কর্মকান্ড সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরেও সাংগঠনিকভাবে পেশাগত পরিধিতে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন বাংলাদেশী এসব প্রকৌশলী। লালন করে চলেছেন ত্রিশ বছরের পুরানো ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড আর্কিটেক্টস’ এর মিশিগান চ্যাপ্টারকে।
সারারাত আঁধারে ডুবে থাকার পর ভোরের আকাশের সূর্য প্রতিমা ধরনির চারপাশকে করে আলোয় আলোকিত, বর্ণিল আর স্বপ্নিল। এই স্বপ্নিল আলোয় আলোকিত হতে হলে, ঘর হতে নিজেকে বের হতে হয়, অপরকে বের করতে হয় কিংবা বের হবার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। সূর্যের কাজ কেবল আলো দিয়ে যাওয়া, কেউ ঘর হতে বের হোক বা না হোক ।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71