বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
আমৃত্যু এক বিপ্লবী কর্মবীর
প্রকাশ: ০৩:১১ pm ৩১-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০৪:০২ pm ৩১-১০-২০১৬
 
 
 


অগ্নিযুগের বিপ্লবী ফণী ভূষণ মজুমদারের ৩৫তম মৃত্যু বার্ষিকী ৩১ অক্টোবর। ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি পরলোক গমন করেন।

মৃত্যুর পর কয়েক বছর তাঁর উপর স্মরণিকা প্রকাশসহ স্মরণসভার আয়োজন হলেও এখন আর সেসবের কিছুই হয় না। নীরবে, নিভৃতে কেটে যায় এই ক্ষণজন্মা অকুতোভয় রাজনীতিবিদের মৃত্যু দিবসটি। অথচ উপমহাদেশ এবং বাংলাদেশ ভূখ-ের ত্রিকাল রাজনীতিতে অসাধারণ ভূমিকা পালনকারী এই বিপ্লবী বীরের জীবনালেখ্য ও জীবনাচার হতে পারে যে কারো জন্য অনুকরণীয়।

কেবলমাত্র স্মরণসভা বা স্মরণিকা প্রকাশই নয়, ফণী ভূষণ মজুমদারের রাজনৈতিক কর্মজীবনের উপর রচনা হতে পারে গবেষণাসমৃদ্ধ বিস্তৃত ইতিহাস। বিশেষ করে আদর্শ ও দর্শনভিত্তিক রাজনীতি, পরমত সহিষ্ণুতা, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদদের সাথে আচরণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ যখন বর্তমান সময়কালে প্রায় অদৃশ্যমান, তখন ফণী ভূষণ মজুমদারকে নিয়ে চর্চা করলে তা কিছুটা হলেও আলোকবর্তিকা ছড়াবে এই সামাজিক অবক্ষয়ের যুগে। 

কেমন ছিলেন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের প্রিয় ফণীদা চলনে, বলনে, আচার-আচরণে এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকর্মে তা স্বল্পপরিসর আলোচনায় শেষ করা যাবে না। তবে কিছুটা হলেও সেসবের উপর আলোকপাত করা যেতে পারে।

তাতে প্রথমেই বলতে হয় ভারতবিখ্যাত অম্বিকা চরণ মজুমদারের পারিবারিক সদস্য হিসেবে ফণীদা’র ধমনীতে রাজনৈতিক আদর্শ, অঙ্গীকার, নিষ্ঠা, সততা ও কর্তব্যপরায়নতা প্রবাহমান ছিল। একই সাথে তাঁর বন্ধুবাৎসল্য ও রসবোধ সবাইকে করেছে বিমোহিত। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা ও শোকবার্তায় এই বিষয়গুলো ফুটে ওঠে।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১ নভেম্বর ১৯৮১ তারিখে যেমনটি ফণীদা’র অনুজ ইন্দু ভূষণ মজুমদারকে এক শোকবার্তায় লিখেছিলেন-“I was deeply  grieved to get the sad news of Shri Phani Bhushan Majumder’s death. He  played a significant role in our common struggle for independence from  British colonialism. After attaining that goal he displayed in full his  commitment to the service of his people and his nation. Please accept the  heartfelt sympathy and condolences from the people and Government of  India”|

। ঐ বছরই আরেক তেজস্বী বিপ্লবী পঞ্চানন চক্রবর্তী ‘ফণী : জেলে জেলে’ শিরোনামে যে ধ্রুপদি প্রন্ধটি লিখেন তাতে ফণীদা’র বহু অজানা তথ্য প্রকাশ পায়। ১৯৩০ সালে ফরিদপুর জেল, ১৯৩২ সালে বক্সাদুর্গ এবং ১৯৩৪ সালে দেউলী বন্দীনিবাসে কারাবাসের দিনগুলোতে পঞ্চানন চক্রবর্তী তাঁর রাজনৈতিক অনুজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলী তুলে ধরেন।

তাতে গভীর রাতে গুণগুণিয়ে গান গেয়ে সহরাজবন্দী সকলকে আনন্দ দেয়া, ভোজনবিলাসিতা, বিভিন্ন দল ও মতের রাজবন্দী সকলের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখা, বুদ্ধিমত্তার সাথে জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে ঘায়েল করা, ব্রিটিশ নাগরিক জাদরেল এক জেলারকে চাকুরীতে ইস্তফা দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা, ফণীদা’র ইত্যাদি কর্মকারে অনবদ্য বর্ণনা প্রাঞ্জলভাবে ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশেরও অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ প্রমুখ তাদের অনেক লেখা ও বক্তব্যে ফণীদা সম্পর্কে তুলে ধরেছেন অনেক মূল্যবান তথ্য এবং তাঁর নির্মোহ ও দৃঢ়চেতা চারিত্রিক গুণাবলী। সঙ্গত কারণে সেসবের বর্ণনা দেয়া এখানে সম্ভব নয়, তা অনুচিতও বটে।

তাই সেদিকে না গিয়ে ফণীদা’র শেষ জীবনের সহচর হিসেবে দু’একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলেই মনে করছি। 
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর কুচক্রী মহল ও সামরিক স্বৈরাচার নানাভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অবদমিত ও খর্বকরনে নানা প্রকার ফন্দিফিকির আটে। এসব কাজের অংশ হিসেবে তারা ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

এই নির্বাচনের পূর্বে অহেতুক তৎকালীন অবিভক্ত ফরিদপুর জেলার আসনগুলোর সীমানা পুনঃর্নির্ধারণ করা হয়। এতে তৎকালীন গোপালগঞ্জ এবং মাদারীপুর মহাকুমাকে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হয়, উদ্দেশ্য- আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা হ্রাস করা। সে সময়ে সাধারণত সংসদ নির্বাচনের জন্য কোনও মহাকুমার থানাগুলোকে বিন্যস্ত করেই ঐ মহাকুমার আসনগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হতো।

কিন্তু ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ফরিদপুর-১১ আসনের সীমানা গোপালগঞ্জ মহাকুমার গোটা কোটালীপাড়া থানা এবং মাদারীপুর মহাকুমার রাজৈর থানার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে পুনর্গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ফণীদা’কে ঐ আসনের প্রার্থী মনোনীত করে। এর আগে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-মাদারীপুর আসন থেকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসংশ্লিষ্ট ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে ফণীদা রাজৈর থানা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১৯ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

কিন্তু নতুনভাবে বিন্যস্ত আসনে বিজয়ী হয়ে আসার বিষয়টি ছিল ফণীদা’র জন্য চ্যালেঞ্জের। কারণ সেনা ছাউনিতে সৃষ্ট দল বিএনপি ঐ আসনে মনোনয়ন দেয় তফসিল ফেডারেশন সমর্থিত এক নেতাকে। উল্লেখ্য, তৎকালীন ফরিদপুর-১১ আসনে ৬৫% এর অধিক ভোটার ছিলেন তফসিল সম্প্রদায়ভুক্ত। অন্যদিকে সেনা শাসকের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু’র এক ভাগ্নে ঐ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।

উক্ত প্রার্থী পোস্টারে তার নির্বাচনী প্রতীক ছাতা’র পাশে বঙ্গবন্ধু’র ছবি এবং ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগ্যান মুদ্রণ করে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে থাকেন। আর বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে বলে তার প্রতি সমর্থন দেয় কোটালীপাড়া থানা শাখা আওয়ামী লীগ।

এভাবে সরকারী চক্রান্ত এবং স্থানীয়ভাবে নিজ দলের অসহযোগিতা মোকাবেলা করে নি¤œভূমি কোটালীপাড়ার দুর্গম অঞ্চলগুলোতে মাঘের কনকনে শীতে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো সে সময়ে অশীতিপর ফণীদা’র জন্য সত্যিই কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বরাবরের ন্যায় তিনি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণপূর্বক নির্বাচন পরিচালনায় কতিপয় কৌশলী পন্থা অবলম্বন করেন। এসবের মধ্যে তিনি প্রথম যে কাজটি করেন, তা হচ্ছে- কোটালীপাড়ায় স্থানীয়ভাবে অন্যতম প্রভাবশালী, বিদ্যানুরাগী ও সমাজসেবী এক তফসিল নেতার বাড়ীতে অবস্থান করে সেখান থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। আর কোটালীপাড়া থানা শাখা আওয়ামী লীগ তাঁর বিরোধীতা করছিল বিধায় গোপালগঞ্জ জেলা শাখা আওয়ামী লীগের একদল নেতাকর্মীদেরকে কোটালীপাড়া নিয়ে এসে তাদেরকে প্রচারণার কাজে লাগান।

তবে জলকাদা পেরিয়ে বাড়ী-বাড়ী গিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কুশল বিনিময় এবং তাদের সুখদুঃখের কথা মনোযোগসহকারে শ্রবণের উপর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এতে মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। যখনই তারা শুনতে পেয়েছে অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং সংসার বিবাগী ফণী ভূষণ মজুমদার তাদের এলাকায় আসছেন, পিঁপড়ের মত লাইন পড়ে যেতে থাকে তাঁকে একনজর দেখার জন্য।

গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো ফণীদা’কে শঙ্খ বাঁজিয়ে ও উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নিয়েছে, ইষ্ট দেবতার নিকট প্রার্থনা ও মানত করেছে। এভাবে এক মাস দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন শেষে ফলাফল ঘোষিত হলে দেখা যায় বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে দ্বিগুণেরও অধিক ভোট পেয়ে ফণীদা’ বিজয়ী হয়েছেন। উল্লেখ্য, সর্বৈব কারচুপির ঐ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ মাত্র ৩৯টি আসন পায়।

জীবনের শেষ নির্বাচনে বিজয়ের জন্য ফণীদা’কে যে পরিমাণ অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল তার ধকল গিয়ে পড়ে তাঁর শরীরের উপর। তাই নির্বাচনের পরপরই তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সুস্থতা এবং অসুস্থতার দোলাচলে ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা মেডিকেলের ১০ নম্বর কেবিনে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভিড় লেগেই থাকত।

রাজনৈতিক দলসমূহের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, সামাজিক, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও শিক্ষা জগতসহ রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময়ে ফণীদা’র স্বাস্থ্য বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ছুটে আসতেন সেখানে। তাই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা- থেমে থাকেনি বিন্দুমাত্র। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ডামাডোলে সে সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সরগরম থাকার কারণে তিনি তাতে অংশগ্রহণ করতে পারছিলেন না বিধায় এক ধরণের অস্থিরতায় ভুগতে দেখা যায় তাঁকে।

আওয়ামী লীগের তরফে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নজরে আনলে সীমিত আকারে ১০ নম্বর কেবিনে দলীয় প্রেসিডিয়াম সভা করার অনুমতি দেয়া হয়। যথাসময়ে সেই সভা অনুষ্ঠিতও হয়। হাসপাতালে রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ ফোরামের সভা অনুষ্ঠান সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

 মূলত ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সামরিক স্বৈরাচারের চক্রান্তমূলক নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়েই ফণীদা’র শরীর ভেঙ্গে পড়ে, যা থেকে ঐ বয়সে সেড়ে ওঠা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশে জীবনের নানা পর্যায়ে নানা প্রকার ঝুঁকি নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক ভুবনে দৃঢ় পদচারণা করেছেন বিপ্লবী কর্মবীর ফণী ভূষণ মজুমদার। পয়ত্রিশতম মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি প্রণতি ও  শ্রদ্ধা জানাই।

এইবেলাডটকম/বীরেন্দ্র//গোপাল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71