শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
শনিবার, ১১ই ফাল্গুন ১৪২৫
সর্বশেষ
 
 
বেলকুচিতে কালের সাক্ষী: গরুর গাড়ি
প্রকাশ: ০৭:৫৯ am ১২-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:৫৯ am ১২-০২-২০১৭
 
 
 


সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা তাঁত শিল্প এলাকা। এ এলাকায় গরুর গাড়ীতে করে সুতার বেল, কাপড়ে বেল নিয়ে ব্যবসায়ীরা ভোরে হাটে যেত এবং কৃষকরা গরুরগাড়ীতে করে ক্ষেতের ধান নিয়ে আসতো বাড়িতে।

এখন আর সেই গরু গাড়ী শুধু বেলকুচি উপজেলায় কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। পূর্বে গ্রামবাংলার জনপ্রিয় গরুর গাড়ি কৃষি প্রধান সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি ও অন্যান্য উপজেলার অনেক অঞ্চলে কালের সাক্ষী।

মাঝে মধ্যে জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় দু-একটি গরুর গাড়ি চোখে পড়লেও শহরাঞ্চলে একেবারেই দেখা যায় না। আধুনিক সভ্যতায় ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে।

সে কারণে শহরের ছেলে-মেয়েরাতো দূরের কথা, বর্তমানে গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও গরুর গাড়ির শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয়। আবার অনেক শহুরে শিশু গরুর গাড়ি দেখলে বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে গরুর গাড়ি সম্বন্ধে।

যুগ যুগ ধরে গরুর গাড়ি কৃষকের কৃষিক্ষেত্রে ফসল বপন এবং ফসল আনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে পরিচিত। গরুর হল দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা এক প্রকার যান বিশেষ।

এ যানে সাধারণত একটি মাত্র অরের সাথে চাকা দুটি যুক্ত থাকে। সামনের দিকে একটি জোয়ালের সাথে দুটি গরু বা বলদ এবং মহিষ জুতে এ গাড়ি টানা হয়। সাধারণত চালক বসেন গাড়ির সামনের দিকে।

আর পিছনে বসেন যাত্রীরা। বিভিন্ন মালপত্র বহন করা হয় গাড়ির পিছন দিকে। বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য ও ফসল বহনের কাজে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল ব্যাপক।

গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে গরুর গাড়ি এক দশক আগেও যাতায়াত ও মালবহনের কাজে অনেক ব্যবহৃত হত। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টজন্মের ১৫০০ থেকে ১৬০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে।

উনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন জনপ্রিয় উপন্যাসেও দক্ষিন আফ্রিকার যাতায়াত ও মালবহনের উপায় হিসেবে গরুর গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এইচ. রাইডার হ্যাগার্ড’এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কিং সলোমন্‌ মাইনস্’ নামক উপন্যাসেও গরুর গাড়ি সম্বন্ধে বর্ণনা রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাতে রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বা বিপদে পড়লে তারা প্রায়শই গরুর গাড়িগুলোকে গোল করে সাজিয়ে এক ধরনের দুর্গ গড়ে তুলে তার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করত।

চেঙ্গিজ খানের নাতি বাতু খানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে যে মোঘল আক্রমণ চলে সেখানে তার প্রতিরোধে স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা গরুর গাড়ির ব্যবহার করা হয়েছিল।

দুই যুগ আগে গরুর গাড়িতে চড়ে বর-বধু যেত। গরুর গাড়ি ছাড়া বিয়ে হতো না। বিয়ে বাড়ি বা মাল পরিবহনে গরুর গাড়ি ছিল একমাত্র ভরসা।

বর পরে লোকজন, বরযাত্রী ও ডুলিবিবিরা বিয়ের জন্যে ১০ থেকে ১২টি গরুর গাড়ির ছাওনি (টাপর) সাজিয়ে শশুরবাড়ী ও বাবার বাড়ী আসা যাওয়া করতো।

রাস্তা- ঘাটে গরুর গাড়ি থেকে পটকাও ফুটাতো। যে সব গৃহস্থ পরিবারের গরুর গাড়ি ছিল, তাদের কদরের সীমা ছিল না। কৃষকরা প্রতিদিন ফজরের আজানেরআগে গরুর গাড়িতে কখনো জৈব সার তথা গোবরের সার, কখনো গরুরখাবার ও লাঙল-মই- জোয়াল নিয়ে যেত মাঠে।

উঁচু সুরে গাইত,‘ওকি গাড়িয়াল ভাই.....................’। গরুর চালক বা গাড়িওয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলতো বধু, ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, আস্তে বোলাও গাড়ি, আরেক নজর দেখিবার নাও মুই দয়ার বাপের বাড়িরে গাড়িয়াল’।

৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটারের রাস্তা পাড়ি দিয়ে কৃষকেরা জমি চাষাবাদ এবং মালামাল বহনের জন্য গরুর গাড়ি বাহন হিসেবে ব্যবহার করতো। অনেক অঞ্চলে রাস্তা পাকা না থাকায় এক সময় যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করতো না।

ফলে গরুর গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। তবে বর্তমানে নানাধরণের মোটরচালিত যানের আধিক্যর কারণে অপোকৃত ধীর গতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। বর্তমান যুগ হচ্ছে যান্ত্রিক যুগ।

মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের জন্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাক, পাওয়ার টিলার, লরি, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন মালগাড়ি।

মানুষের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, বেবী ট্যাক্সি, রিকশা ইত্যাদি। ফলে গ্রামাঞ্চলেও আর চোখে পড়ে না গরুর গাড়ি।

অথচ গরুর গাড়ির একটি সুবিধা হলো, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। ফলে ধোঁয়া হয় না। পরিবেশের কোনো ক্ষতিও করে না। এটি হচ্ছে, পরিবেশবান্ধব একটি যানবাহন।

 

এইবেলাডটকম/চন্দন/গোপাল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71