eibela24.com
মঙ্গলবার, ১৩, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
রাজাপুরে বিষাক্ত পানি ব্যবহারে চর্ম ও শ্বাসকষ্ট রোগ দেখা দিচ্ছে     
আপডেট: ০২:১৪ pm ০৮-১০-২০১৭
 
 


ঝালকাঠির রাজাপুরে খালে বিষ দিয়ে মাছ নিধন চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একের পর এক খালে ওস্তাদ সাইবারমাথিং রোটেনন প্রয়োগের ফলে জেলার বিভিন্ন খালের পোনসহ মাছ নিধন অব্যাহত থাকলেও প্রশাসন নিরব ভূমিকায় থাকায় বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য সম্পদ রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। 

২৭ সেপ্টেম্বর রাজাপুর উপজেলার নৈকাঠি গ্রামের বড় ব্রিজ (জেবিসি ব্রিকস) সংলগ্ন খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের প্রচেষ্টা চালায়। ট্রলারযোগে একদল লোক এসে মাছ নিধনের জন্য বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের প্রক্রিয়া শুরু করে। এসময় ব্রিকস’র নৈশ প্রহরী ও কর্মচারী তাদের বাধা দেয়। দু’পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষে মারামারিও হয়। এছাড়াও বাগড়ির ধানসিড়ি, তুলাতলার জাঙ্গালিয়া ও গাজিরহাট, সাতুরিয়া, লেবুবুনিয়া, বাশতলা, উত্তমপুরের সহ বিভিন্ন শাখা খালে প্রায় বিষ দেয়া হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের দেলদুয়ার গ্রামেও একটি চক্র খালে বিষ প্রয়োগ করে। মাছ ভেসে উঠতে শুরু করলে ফজরের আজান দেয়ায় মুসল্লিরা নামাজে বের হলে আহরণকারীরা পালিয়ে যায় বলে জানান ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেন। 

তিনি আরো জানান, ওই সময়ের দেয়া বিষে এখনও মাছ মরে ভেসে উঠছে। কিছু মাছ সংগ্রহ করে বাসায়ও এনেছি। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার গোদন্ডা গ্রামে হাওলাদার মৎস্য খামারের একটি ঘেরে বিষ প্রয়োগ করে ১০ লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে দুর্বৃত্তরা বিষ প্রয়োগ করায় বুধবার সকালে ঘেরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে ওঠে। 

ঘেরের মালিক আবদুর রহিম হাওলাদার জানান, গোদন্ডা গ্রামে ৬০ একর জমিতে চলতি বছরের শুরুতে মাছের ঘেরটি করা হয়। ঘেরে রুই, কাতলা, গ্রাস, মিনারকাপ ও সিলভারকাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করা হয়। মঙ্গলবার রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা মাছের ঘেরে বিষ প্রয়োগ করে। সকালে স্থানীয়রা পানিতে মাছ ভাসতে দেখেন। খবর পেয়ে ঘেরের লোকজন এসে মরা মাছগুলো ঘের থেকে তুলে ওপরে ওঠান। এতে তার প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ঘের মালিক দাবি করেছেন। 

জেলার এ তিন স্থান ছাড়াও ভান্ডারিয়া নদীর সাথে সংযুক্ত রাজাপুরের চাড়াখালি, কাঠালিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া, বিষখালী নদীতে সংযুক্ত পূর্ব ছিটকি, সদর উপজেলার বাউকাঠি, নবগ্রাম, শেখেরহাট, চাঁনপুরা, দেউরী খালেও বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন করা হয়েছে। ঝালকাঠির বিভিন্ন খাল ও জলাশয়ে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগে গলদা চিংড়িসহ দেশীয় মাছ নিধন করা হচ্ছে। ফলে বিলুপ্তির পথে দাঁড়িয়েছে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ। অন্যদিকে পরিবেশ দূষিত হয়ে মানবদেহে নানান ব্যধি আক্রান্তের আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ঝালকাঠি মৎস্য বিভাগের নীরব ভূমিকায় গভীর রাতে একটি কুচক্রিমহল ভাটার সময় বিষাক্ত পদার্থ ওস্তাদ সাইবারমাথিং (তরল জাতীয়) ও রোটেনন (পাউডার) প্রয়োগ করে। কিছুক্ষণ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পানির নীচে থাকা গলদা চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ অচেতন হয়ে ভেসে ওঠে। তখন অপেক্ষমান জেলে চক্র জাল ফেলে এ মাছ আহরণ করে। ঝালকাঠি জেলায় গলদা চিংড়ির চাষ না হলেও বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে গলদা চিংড়ি পাওয়া যায়। এসব চিংড়ির কেজি ৫/৬শ টাকা করে বিক্রি হয়। সাজি বা চালায় করে রাস্তায় হেটেও বিক্রি করা হচ্ছে এভাবে শিকার করা গলদা চিংড়িসহ দেশীয় মাছ।  কীটনাশক বিক্রেতা রিয়ানা স্টোরের সত্ত্বাধিকারী মোঃ তরিকুল ইসলাম রাজু জানান, ওস্তাদ সাইবারমাথিং শাকসব্জির কীটপতঙ্গনাশক এবং রোটেনন পাউডার রাক্ষুসে মাছ মারার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

উল্লেখিত কীটনাশক প্যাকেটের গায়ে সতর্কবাণি হিসেবে লেখা রয়েছে মানুষ ও পাখির নাগালের বাইরে রাখুন। ব্যবহারের সময় নাক-মুখ সুতি কাপড় দিয়ে বেধে নিন। ৭ দিন ওই পানি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ বলেও লেখা রয়েছে প্যাকেটের গায়ে। এ থেকে সহজেই বুঝা উচিত ওই ধরনের কীটনাশক ব্যাবহার কতটা ক্ষতিকর।  ঝালকাঠি জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, অসাধু জেলেদের একটি চক্র এ অপকর্ম করে থাকে। কিন্তু তাদেরকে ধরা যাচ্ছে না। বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে এসব গলদা চিংড়ি ধরার পর সাদাটে ও শুষ্ক হয়ে যায় বলেও জানান তিনি। ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রীতিষ কুমার মল্লিক জানান, ঝালকাঠির জেলায় অনেকগুলো খাল রয়েছে। কোন খালে কখন বিষ ফেলে মাছ নিধন করছে তা জানা মুশকিল। স্থানীয়রা এ বিষয়ে আমাদের অবহিত করলে ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে অভিযান চালানোয় কোন তহবিল না থাকায় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ গোলাম ফরহাদ জানান, বিষাক্ত পদার্থ পানিতে মিশে গেলে এ ধরনের পানি ব্যবহার ও মাছ খেলে মানুষের শরীরে চর্ম এবং শ্বাসকষ্ট রোগ দেখা দিতে পারে।

আর/আরডি/