eibela24.com
শুক্রবার, ১৯, জুলাই, ২০১৯
 

 
জিলিয়ানের সেবায় সিক্ত মেহেরপুরবাসী 
আপডেট: ১১:৪৭ am ০৩-০৩-২০১৮
 
 


জৌলুসপূর্ণ জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে এ দেশের মানুষ ও প্রকৃতির মায়ায় নিজ দেশে আর ফেরা হয়নি ব্রিটিশ নার্স জিলিয়ানের। ৫৪ বছর ধরে তিনি এ দেশের মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। 

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর মিশনারি হাসপাতালের নার্স জিলিয়ান এম রোজ নিজ উদ্যোগে এলাকায় গড়ে তুলেছেন বৃদ্ধাশ্রমও। এতদিন ধরে এ দেশে সেবা দিয়ে যাওয়া এই সেবাব্রতী এখনও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাননি। তবু এলাকার মানুষ তাকে 'মা' বলেই ডাকে।

৮৮ বছর বয়সী এই সেবিকা বললেন, নিজের ভালোবাসা অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার যে আত্মতৃপ্তি, তা ভোগবিলাসের মধ্যে মোটেই পাওয়া যায় না। মানুষকে ভালোবাসলে স্রষ্টার কৃপা বা ভালোবাসা পাওয়া সহজ হয়। 

জিলিয়ান বলেন, ১৯৬৪ সালে কর্তব্যকাজে বরিশাল এসেছিলাম। সে সময় বাংলাদেশের মানুষ, মাটি ও প্রকৃতি কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। বাংলাদেশে অবস্থানকালে কাজের ফাঁকে ইচ্ছামতো ঘুরেছিলাম এখান-ওখানে। পরে নিজ দেশে মা, মাটি ও স্বজনের টানে ফিরে যাই। সেই ফেরা শেষ ফেরা হয়নি। এ দেশের মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৭৪ সালে আবার চলে আসি বাংলাদেশে। দেশে নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেবার যে ব্রত নিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নে লেগে যাই প্রথমে খুলনায়। পরে মেহেরপুর মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর হাসপাতালে। বিয়ে করা হয়নি। কখন যে এ দেশে ৫৪ বছর পার হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি। যত দিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এভাবে সেবা দিয়ে যাবেন বলে জানান জিলিয়ান। 

অন্য দেশের নাগরিক হয়েও এ দেশের মানুষকে পরম মমতা ও যত্নে সেবা প্রদান করে সবার মন কেড়েছেন তিনি। সবার প্রিয়মুখ নিভৃতচারী জিলিয়ান এম রোজ। জিলিয়ানের এখন একটাই চাওয়া- বাংলার মাটিতে শেষ বিদায়। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারায় বেশ খুশি জিলিয়ান। যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এভাবে মানুষকে সেবা দিয়ে যাবেন। তার প্রত্যাশা, বাংলাদেশ তাকে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেবে। 

পরিবার তাকে একাধিকবার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা জানালেও তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জিলিয়ান জানান, সরকার যদি তাকে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেয়, তাহলে তার সম্মান বাড়বে। তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এভাবে সেবা দিয়ে যাবেন। রোজের ভাষায়, পৃথিবীতে এসেছি সেবা দিতে। বৃদ্ধাদের জন্য কেউ কিছু করে না। তাই আমি নিজে একটি বৃদ্ধাশ্রম খুলেছি। তারা যেন ভালোভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। 

বল্লভপুর মিশন হাসপাতালে কর্মরত সিনিয়র নার্স নীলসুরি সরিন জানান, সর্বক্ষণ তিনি মানুষকে সেবা দিয়ে চলেছেন। নিজের জন্য কোনো কিছু করেন না তিনি। নিজ উদ্যোগে এখানে একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলেছেন। যেখানে বর্তমানে ১৫ জন বৃদ্ধা আছেন। তিনি গ্রামে ঘুরে বাড়ি বাড়ি সেবা দিয়ে আসেন। রাত-দিন যে কোনো সময় তাকে ডাকলে তিনি ছুটে যান সেবা দিতে। অনেক গরিব রোগী তার কাছ থেকে সেবা ও ওষুধ বিনামূল্যে পেয়ে থাকেন। বল্লভপুর গ্রামবাসী জানান, জিলিয়ান এম রোজ তাদের কাছে দেবতার মতো। যে কোনো সমস্যায় তার কাছে গেলে সমাধান পাওয়া যায়। এলাকার মানুষ তাকে মা হিসেবে ডাকে।

মেহেরপুর বড়বাজারের ব্যবসায়ী রিপন জামান বলেন, তার সন্তান অসুস্থ হলে ইনকিউবেটরের প্রয়োজন হয়। মেহেরপুর হাসপাতালে ইনকিউবেটর না থাকায় পাঠানো হয় বল্লভপুর হাসপাতালে। সেখানে জিলিয়ান তার সন্তানকে পরম মমতায় সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। মনে হয় কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেয়ে কোনো অংশে কম নন তিনি।

বাগুয়ান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে জিলিয়ান এ অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে তাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি সরকারের প্রতি জিলিয়ানকে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। 

মুজিবনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অত্র এলাকার যশোরের ফাতেমা হাসপাতাল ও মেহেরপুরের বল্লভপুর হাসপাতাল চিকিৎসার জন্য মানুষের ভরসার স্থল ছিল। এখন জেলা ও উপজেলায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় বল্লভপুর হাসপাতালের জৌলুস আগের মতো না থাকলেও জিলিয়ানের সেবার মান কমেনি এক বিন্দুও। 

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ জানান, বাংলাদেশকে যে মানুষটি এত ভালোবেসেছেন, নিশ্চয়ই বাংলাদেশও তাকে ভালোবাসবে। জিলিয়ান এম রোজ যদি আমাদের কাছে দ্বৈত নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, তাহলে আমরা সরকারের কাছে তার আবেদনটি তুলে ধরব। জিলিয়ানের কাজে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে জানান তিনি।

প্রচ