eibela24.com
বৃহস্পতিবার, ২০, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
অগ্নিঝরা দিনের স্মৃতিতে বোয়ালখালীর দত্তবাড়ি
আপডেট: ০৯:৩১ pm ১১-০৩-২০১৮
 
 


১৯৭১ সালের মার্চ মাস। উত্তাল সারাদেশ। শিবানীরা তখন ৭ম শ্রেণির ছাত্রী। দেশে কিছু একটা হতে চলেছে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এর প্রভাব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। শহর থেকে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে মানুষ গ্রামে আসতে শুরু করেছে। অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে যায় শিবানীদের বিদ্যালয়। শত শত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয় শিবানীদের ঘরে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারাও সশস্ত্র অবস্থান নেয়।

আশ্রিতদের খাদ্যের জোগান দিতে শিবানীর বাবা যতীশ দত্ত ও তার জেঠা চিন্তাহরণ দত্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ঘরে মজুদকৃত গোলার ধান, পুকুরের মাছ, খেতের সবজি দিয়ে আশ্রিতদের মুখে তুলে দেয় খাবার। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়ায় গ্রামের অনেকেই বলেছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবে ও প্রাণে মেরে ফেলবে। এ ভয়কে তুচ্ছ করে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন দত্ত পরিবার।

যুদ্ধচলাকালীন সময়ে শত শত লোকের আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের জ্যৈষ্টপুরা গ্রামের দত্ত পরিবার। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনী এ গ্রামে হানা দিয়েছিল একবার। গ্রামের অনেক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় সেই দিন। বাদ যায়নি শিবানীদের ঘরও। পাক হানাদার বাহিনী আসার খবরে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল শিবানীরাসহ গ্রামের সকলে। এরপর পেরিয়ে গেছে অনেকদিন। তবে সেই অগ্নিঝরা দিনের স্মৃতি বয়ে চলেছে টিনের ছাউনি দেয়া মাটির তৈরি দোতলা দত্ত বাড়ি।
জ্যৈষ্টপুরা গ্রামের সম্ভ্রান্ত জমিদার প্রয়াত উমাচরণ দত্তের স্ত্রী সরলা দত্ত, শ্যালক মহেন্দ্র, দুই ছেলে যতিশ দত্ত ও চিন্তাহরণ দত্ত পরিবার নিয়ে বাড়িতে বসবাস করতেন। যতিশ দত্তের তিন ছেলে সুনীল দত্ত, আশুতোষ দত্ত, অনিল দত্ত ও তিন মেয়ে মিন্টু দত্ত, দিপালী দত্ত, শিবানী দত্ত। চিন্তাহরণ দত্তের এক ছেলে সাধন দত্ত। সেই সময়ের অনেকেই আজ প্রয়াত।

যুদ্ধের পরে এ বাড়ির লোকজনের খবর আর কেউ নেয়নি বলে জানান সেই সময়ের মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শিবানী দত্ত ও তার বড় বোন দিপালী দত্ত। বড় বোনদের বিয়ে হলেও শিবানী কুমারীই রয়ে যান। তিনি নগরীর কাট্টলী সিটি করপোরেশন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন।

চিন্তাহরণ দত্তের একমাত্র ছেলে সাধন দত্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনিও বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো ধরনের স্বীকৃতি পায়নি এ পরিবারটি। 

এতে তাদের আক্ষেপ নেই জানিয়ে শিবানী দত্ত বলেন, এ বাড়ির সবাই মুক্তিযুদ্ধের সময় অকাতরে মানুষদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারীদের মূল্যায়ন করছে। সেই সুবাদে এ বাড়ির নাম যেন সরকারি খাতায় ও ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়।

যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালে মার্চ মাস থেকে দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত দত্ত বাড়ির লোকজন মুক্তিযোদ্ধা ও পালিয়ে আসা মানুষজনদের সহযোগিতা করেছে। এছাড়া এ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসা-যাওয়া করত। পাহাড় কাছে হওয়ায় আর দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে পাকহানাদার বাহিনী এ এলাকায় সহজে হানা দিতে পারত না। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এ দত্ত বাড়ি। 

স্থানীয় চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোকারম জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে এ বাড়ির অবদানের কথা অনেক শুনেছি। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহ স্থানগুলো শনাক্ত করে যথাযথ মূল্যায়নে কাজ করছে।

আরপি