eibela24.com
সোমবার, ২৪, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
বৈশাখকে সামনে রেখে ফুল ও খেলনা তৈরীতে ব্যস্ত কারিগররা
আপডেট: ০৯:১৯ pm ১৩-০৪-২০১৮
 
 


পুরানো সব জীর্ণতা আর গ্লানি মুছে বৈশাখ বাঙালির জীবনে নিয়ে আসছে নতুন দিনের নতুন বছরের এক অনন্য আনন্দ উৎসব। আর এই বৈশাখকে বরণ করার জন্য চলছে নানান প্রস্তুতি। এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। আর একদিন পরই পহেলা বৈশাখ। 

তাই পহেলা বৈশাখ এবং মাস জুড়ে বৈশাখী বিভিন্ন মেলাকে সামনে রেখে মাটি দিয়ে তৈরী বর কনে, পশু-পাখি, ব্যাংকসহ বিভিন্ন খেলনা, নানান রঙের ও প্রকারের বাহারী কাগজ, কাপড় ও শোলা দিয়ে গোলাপ, স্টার, সূর্যমুখি, কিরনমালা, মানিক চাঁদ, জবা, বিস্কুট, গাঁদা সহ বিভিন্ন নামের কৃত্রিম ফুল ও বাঁশি তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নওগাঁর কারিগররা। 

নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত সুলতানপুর, দেবীপুর, শৌলগাছি ও আত্রাই উপজেলার জামগ্রামের কারিগররা। সারা বছরই তারা এসব তৈরীর সাথে জড়িত। আর এটিকে তারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে কাঁচামাল, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি সেই সাথে আধুনিক প্লাষ্টিক খেলনার সাথে পাল্লা দিয়ে টিকতে না পারায় মাটির খেলনা তৈরী ও বিক্রি অলাভজনক হয়ে পড়ায় বিশেষ দিবস ঈদ, পূজা, পার্বণ ও মেলা ছাড়া কুমারপাড়ায় খেলনা তৈরী করছেন না জেলার কারিগররা।

জেলার নওগাঁর সদর উপজেলার  সুলতানপুর, রাণীনগর উপজেলার আতাইকুলা, মহাদেবপুর উপজেলার  শিবপুর সুলতানপুর গ্রামের কুমারপাড়া গুলো মাটির খেলনা তৈরীর জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এসব গ্রামে ও এখন আর বিশেষ দিবস ও মেলা ছাড়া খেলনা তৈরী করেন না কারিগররা। তবে হাড়ি পাতিল ও রান্নার বাসনপত্র তৈরী করে কোন রকমে টিকে রেখেছেন তারা বাপ দাদার এই পেশাকে। 

কারিগর সমনাথ মহন্ত ও অরুন কুমার পাল বলছেন, মাটির খেলনা তৈরীর উপকরণ (কাঁচামাল) জ্বালানী কাঠ, মাটি, রং ইত্যাদির দাম ও পরিবহন খরচ ২/৩ গুন বাড়লেও খেলনার দাম সেভাবে বাড়েনি আর কেনা-বেচাও খুবই কম। বিভিন্ন ধরনের ১ হাজার খেলনা মেলায় বিক্রি করে সব খরচবাদে টেকে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। যা দিয়ে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই অধিকাংশ কারিগররা এখন জীবন জীবিকার প্রয়োজনে চলে যাচ্ছেন ভিন্ন পেশায়।

মৃৎ শিল্প তথা ঐতিহ্যবাহি মাটির খেলনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এ সব লোকজ শিল্পের কারিগরদের আর্থিকভাবে সহায়তা করা প্রয়োজন বলে জানান  মৃৎ শিল্পের কারিগররা। 

নওগাঁর সদর উপজেলার দেবীপুর গ্রাম বাঁশি গ্রাম হিসেবে পরিচিত। বৈশাখের মেলাকে সামনে রেখে বাঁশি তৈরীতে নল কাটা, সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য জড়ি প্যাচানো ও বিভিন্ন রঙের বেলুন লাগানোর কাজে ব্যস্ত কারিগররা। এ গ্রামের প্রায় তিনশ পরিবারের মধ্যে আড়াইশ পরিবারই বাঁশি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

সারা বছরই বাঁশি তৈরী করা হয়। বাড়ীর পুরুষরা বাঁশি নিয়ে বিভিন্ন জেলার মেলাতে ৭-১৫ দিনের জন্য বেরিয়ে যান। বিক্রি শেষে যা লাভ থাকে তাই চলে তাদের সংসার। আর মেয়েরা সাংসারিক কাজের পাশাপাশি বাঁশি তৈরী করেন। এতে পুরুষরাও সহযোগীতা করে থাকেন। এছাড়া পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারকে সহযোগীতা করে থাকেন।

আজিম উদ্দিন ও হেলাল হোসেন জানান, বৈশাখীর বিভিন্ন মেলা, ঈদ ও পূজা পার্বণে বাঁশির চাহিদা থাকে বেশি। স্থানীয়দের কাছে পাইকারী ও খুচরা বাঁশি বিক্রি করে দেড় থেকে দুইশ টাকা লাভ হয়। এছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, খুলনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় পাইকারী বিক্রি করা হয়।
 
এই গ্রাম থেকে বছরের প্রায় ৫০ লাখের মতো বাঁশি দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে। এমনকি বিদেশেও পাঠানো হয়। সঠিক পৃষ্টপোশকতা পেলে এসব কারিগরা আর্থিক দিক থেকে আরো উন্নয়ন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার ভোঁপাড়া ইউনিয়েনের একেবারেই অবহেলিত একটি গ্রাম জামগ্রাম। নেই কোন ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের মধ্যে এটিই একমাত্র গ্রাম যেখানে কাগজ, কাপড় ও শোলার রঙ্গিন বাহারী বিভিন্ন রকমের কৃত্রিম ফুল তৈরি করা হয়। এখানকার তৈরি ফুলই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উৎসব, ঈদ ও মেলাতে পুরুষরা নিয়ে গিয়ে ফেরি করে বিক্রয় করে। লাভও দ্বিগুন। কিন্তু যোগ্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখনো এই হস্ত শিল্পটি আধুনকিতার দ্বোড় গোড়ায় পৌছেনি। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে গাছের ছায়া ভেজা বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন মিলে বসে বসে তৈরি করছে এই ফুলগুলো। বাংলাদেশের মধ্যে নানান রঙ্গের মন কাড়ানো এই সব বাহারী রঙ্গিন ফুল তৈরিতে এই জামগ্রামই একমাত্র গ্রাম। শুধুমাত্র এই গ্রামেই তৈরি করা হয় এই সব ফুল। তৈরির পর পরিবারের পুরুষরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে বিক্রয় করে। তবে দুই ঈদে, বিভিন্ন পূজা, মেলা ও পহেলা বৈশাখে এই সব ফুলের চাহিদা অনেক বেশি। প্রায় ৫০-৬০ বছর পূর্বে গ্রামে এই ফুল তৈরি করা শুরু হয় কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের হাত ধরে। এখন তা পুরো গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকা ও আয়ের একমাত্র উৎসে পরিণত হয়েছে। এই ফুলে লাভ অনেক বেশি। একটি ফুল প্রায় দ্বিগুন মূল্যে বিক্রয় হয়। বর্তমানে এই গ্রামের প্রায় ৭শ পরিবার এই বাহারী ফুল তৈরি করার কাজে নিয়োজিত। সংসার দেখভাল করার পাশাপাশি এই গ্রামের মহিলা, পুরুষ ও ছোট-বড় সবাই এই ফুল তৈরি করার কাজ করে।

রফিকুল ইসলাম জানান, এক সময় এই গ্রাম খুবই অবহেলিত ছিল। রাস্তা-ঘাট কোনটিই ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে একটু হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। এই গ্রামে এখনো পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসে নি। তাই এই সব কারিগররা শত ইচ্ছে থাকলেও রাতে এই ফুল তৈরির কাজ করতে পারে না। তাই আমাদের এই শিল্পটিকে আরো গতিশীল করার জন্য আমাদের প্রয়োজন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ।

মোছা: নিশাত আনজুমান জানান, আমরা আমাদের সংসারের সব কাজ সম্পন্ন করে পরিবারের পুরুষদের এই ফুল তৈরিতে সাহায্য করি। এই ফুলগুলোতে লাভ অনেক বেশি। আগে পুরুষরা বাহিরে গেলে দুবৃর্ত্তরা মাঝে মাঝে সবকিছু ছিনতাই করে নিতো কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন শুধু আমাদের এই গ্রামটিকে আধুনিক মানসম্মত গ্রামে পরিণত করা প্রয়োজন।

জনি সোনার জানান, ফুল তৈরিতে পরিবারের গৃহিণীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন বে-সরকারি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা করে আসছে। তাই মাস শেষে লাভের বেশি ভাগই দিতে হয় এই সব এনজিওতে। তাই সরকার যদি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য বিনা সুদে ঋণ দিতো তাহলে এই হস্ত কুটির শিল্পটি আগামীতে আরো বেশি সম্প্রসারিত হতো। তাই এই গ্রামবাসীর সরাসরি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম জানান, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। যার কদর সারা দেশে। সৌখিন মানুষ ও শিশুদের কাছে এই বাহারী কৃত্রিম ফুলগুলোর চাহিদা অনেক বেশি। এই শিল্পটিকে আরো সম্প্রসারিত করার জন্য সরকারের কাজ করা উচিত। এই গ্রামের মানুষদের আর্থিক ভাবে সহায়তা করতে পারলে তারা এই শিল্পটিকে আরো অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। এতে সরকার এই শিল্প থেকে অনেক অর্থ রাজস্ব হিসাবে আয় করতে পারবে। এই সব কারিগরদের জন্য যদি হস্ত শিল্পটির উপর উন্নত মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে এই শিল্পটি আরো আধুনিক মানসম্মত হতো। আমি চেষ্টা করবো এই গ্রামের মানুষদের কে আরো বেশি বেশি সহযোগিতা করার জন্য। 

এমসি/ বিডি