eibela24.com
রবিবার, ১৮, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
প্রাচীন বাংলার মন্দির–স্থাপত্য
আপডেট: ০৬:২৭ pm ২১-০৪-২০১৮
 
 


পাথর দুর্লভ হওয়ায় বাংলায় পাথরের মন্দির–স্থাপত্য নেই। যা আছে তা ইটের এবং পোড়া মাটির ফলকের তৈরি। শিখর মন্দির যা বাংলায় দেখা যায় তা খড়ের ঘরের মতো আটচালা, দোচালা এবং বাংলার কাঠের রথের মতো করে নির্মিত। 

বাংলার শিব মন্দিরগুলো আটচালার রীতিকে অনুসরণ করে। বাংলার স্থাপত্য পোড়ামাটির মূর্তি বা টেরাকোটা ভাস্কর্যে শোভিত থাকতে দেখা যায়। বাংলার একটি রীতি উত্তর ভারত ও রাজপুতানার বহু স্থাপত্যকে প্রভাবিত করেছে। রীতিটি হলো ছাঁচ। বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন পাওয়া যায় বাঁকুড়ায়। এখানকার মন্দিরগুলো টেরাকোটায় সজ্জিত। দিনাজপুর জেলার কান্তানগরের কান্তজির মন্দির একটি শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। এটি কাঠের রথের আকারে নির্মিত। এছাড়াও বীরভূম, দিনাজপুর, পান্ডুয়া, হুগলি, কুমিল্লা, সহ বাংলার আরো অনেক স্থানে টেরাকোটায় অলংকৃত মন্দির, বিহার, দেউল বাংলার প্রাচীন স্থাপত্যের শিল্প সুষমাকে প্রকাশ করছে।

নির্ম্মলকুমার ঘোষ তার ভারত শিল্প গ্রন্থে লিখেছেন, হিন্দু শিল্প শাস্ত্রের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ মানসারে লেখা হয়েছে যে, প্রজাপতি ব্রহ্ম চারজন দেবশিল্পী সৃষ্টি করেছিলেন। তারা হলেন : বিশ্বকর্মা, ময়, ত্বস্ত্রি এবং মনু; এদের পুত্রদের নাম যথাক্রমে স্থপতি, সূত্রগ্রাহী, বর্ধ্বকী ও তক্ষক। স্থপতি প্রবর্তন করেছিলো স্থাপত্য, সূত্রগ্রাহী করেছিলো নকশা ও মাপজোক ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের ব্যবহারিক বিষয়ের, বর্দ্ধকী করেছিলো চিত্র রচনার নীতি–রীতির প্রবর্তন এবং তক্ষক করেছিলো ধাতুময় শিল্পদ্রব্য কিভাবে উৎপাদন করা যায় তার উদ্ভাবন। মৌর্যযুগে বিভিন্ন শিল্প উপাদনে জড়িতদের শ্রেণী বিভক্তিও দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া আরো যে কয়টি স্থাপত্য বিষয়ক ভারতীয় প্রাচীন গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় সেগুলো হচ্ছে : কাশ্যপ, ময়মত, সারস্বাত্যং, পঞ্চরত্নং, বিশ্বকর্মীয়, মনুষ্যালয় এবং চন্দ্রিকা।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের মতো প্রাচীন বাংলাতেও স্থাপত্যের সাথে অধ্যাত্ম্যচিন্তার এক ধরনের সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। মানুষের শরীরে যেমনি অদৃশ্য আত্মার বসবাস, তেমনি দেউল–মন্দিরেও চিত্তশুদ্ধকামি মানুষের বসবাস। তবে একথা সন্দেহাতীত ভৌগোলিক অবস্থা, আবহাওয়া, জলবায়ু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপত্যকে বিভিন্ন রূপদান করেছে। আবার এক দেশের স্থাপত্যকে অন্যদেশের স্থপতিরা সৌন্দর্য ও আরাম–আয়েশের স্বার্থে নিজেদের মতো করে তৈরি করেও নিয়েছে। স্বাতন্ত্র্য এবং মিথস্ক্রিয়া এদুটোই আবহমানকাল ধরে চলেছে।

প্রাচীন বাংলার পুন্ড্রবর্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণের যে যে স্থানে গৌতমবুদ্ধ ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন, সেই সেই স্থানে মৌর্য স্রাট অশোক স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন এরকম বর্ণনা চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ–এর রয়েছে বলে জানা যায়। পাহাড়পুরতো আছেই , সেই সাথে বাঁকুড়া জেলার বাহুলাড়া ও যোগী–গুম্ফায় কয়েকটি ইটে তৈরি স্তূপ বা স্তূপের নীচের অংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো আসলে স্তূপ, না কি জৈন, বৌদ্ধ কিংবা ব্রাহ্মণ্য মন্দির এ নিয়ে গবেষকদের সংশয় যায় নি।

বিভিন্ন গ্রন্থে বাংলাদেশের প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যকে মৌলিকভাবে তিনভাগে ভাগ করতে দেখা যায়। এই ভাগগুলো হচ্ছে: ১. চালা মন্দির, যা বাংলার একচালা, দোচালা, চৌচালা, আটচালা ইত্যাদি আচ্ছাদনের বসতবাড়ির অনুকরণে তৈরি। ২. রত্ন–মন্দির, যা এক বা একাধিক চূড়া সম্বলিত এবং ৩.দালান মন্দির , যার সামনে থাকে খিলানযুক্ত বারান্দা এবং আরো থাকে বারান্দা সংলগ্ন সমতল ছাদের দেবালয়। চালা মন্দিরের উৎপত্তি হয়েছে বাঙালীর আবহমানকালের গ্রাম–বাংলার কুঁড়েঘরের আদলে। যদিও এই কুঁড়েঘর বর্তমান একুশ শতকের বাংলার গ্রামীণ জীবন থেকে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে নানা আর্থ–সামাজিক ঐতিহাসিক কার্যকারণ নিশ্চয়ই আছে।

বাংলাদেশে প্রাচীন স্থাপত্যের ক্ষেত্রে আরো তিন রীতির কথাও বলা হয়ে থাকে। সেগুলো হচ্ছে: নিজস্ব, মিশ্র ও বহিরাগত। চালা ধরনের স্থাপত্যগুলো নিজস্ব রীতির। রত্ন শ্রেণির স্থাপত্যগুলো মিশ্র রীতির। আর বহিরাগত শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে– কলিঙ্গ, দ্রাবিড়, আর্য–ভারতীয়, ইসলামিক বা মুসলিম এবং ইউরোপীয় পদ্ধতির স্থাপত্য সমূহ। বাংলায় এইসব রীতিতেই স্থাপত্য হয়েছে। আবার নানা কারণে ধ্বংসও হয়ে গেছে। এদেশে প্রত্ন–তাত্ত্বিক গবেষণা ও সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে বহু স্থাপত্যিক নিদর্শন বিলীন হয়ে গেছে। অনেকগুলো এখনো বিলীন হওয়ার পথে। তবু সারাদেশের বিহার মন্দির, দেউল, ইত্যাদির যা কিছুরই সন্ধান মিলেছে তাতে বাংলার প্রাচীন স্থাপত্যের একটি ধারণা অন্ততঃ দাঁড়িয়ে গেছে।

প্রাচ্য–পাশ্চাত্যের শিল্প–তত্ত্ব এবং ইতিহাস আলোচনায় একটি সত্য সম্পর্ক নিঃসন্দেহ হওয়া যায় যে, মানুষের স্থাপত্যের সাথে ভাস্কর্যের সব সময়ই সম্পর্ক ছিলো। ভারতবর্ষে বাস্তুবিদ্যা বা স্থাপত্যের উপর যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে– তার ভিতরেই শিল্প–তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। পরে সেগুলো সংকলন করেই অনেকগুলো শিল্পশাস্ত্র গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে।

বিডি