eibela24.com
সোমবার, ১৯, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
রবিঠাকুর চেতনায় লালন করতেন “কৃষিই বাংলার কৃষ্টি”।
আপডেট: ০৯:০৩ pm ০৭-০৫-২০১৮
 
 


বাংলা সাহিত্যের অগ্রদূত রবিঠাকুর মূলত কবি, ছোট গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত। তার আরেকটি পরিচয়, তিনি একজন কৃষক। 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার পুত্র ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিদারিত্ব চালিয়েছেন। গ্রামেগঞ্জে, মাঠে ময়দানে জমিদারিত্ব চালাতে গিয়ে নিজেও কৃষিকাজের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। গ্রামীণ মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থা উন্নয়নকল্পে রবি ঠাকুর কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চিন্তা ও কর্মের সমন্বয়ে সনাতন কৃষি ব্যবস্থাপনায় এনেছেন আধুনিকতা, বিজ্ঞান, শক্তি ও যান্ত্রিকতায় অপরূপ সমন্বয়।

রবি ঠাকুর জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, জমিদারী কর্মকান্ড তদারকি করতে প্রায়ই গ্রামেগঞ্জে গিয়েছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে মিশেছেন গ্রামীণ মানুষের তথা প্রজাদের সাথে। প্রজাদের অধিকাংশই ছিল কৃষক, কৃষিজীবী বা কৃষিনির্ভর। তাই কৃষকদের সাথে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছেন। একান্তে সময় কাটানো, সান্নিধ্য আসার ফলে সঞ্চয় করেছিলেন বিশাল অভিজ্ঞতা। 

গ্রামীণ পরিবেশ, কৃষক প্রজাদের প্রসঙ্গেই তিনি উচ্চারিত করেছেন, ‘‘আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লী গ্রামের সাথে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে। তখন চাষীদের সাথে আমার প্রত্যহ ছিলো দেখাশোনা। ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে আছে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছায়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয়”। তবুও অতি সাধারণ থেকেও তারা অসাধারণ।

জমিদারি প্রথা মানেই কৃষকের উপর নির্যাতন। তিনিও তাই দেখেছেন। কৃষক প্রজার দুঃখ, দুর্দশা, সনাতন কৃষি ব্যবস্থা সামাজিক শোষণ অনাচার রবিঠাকুর নিজেই উপলব্দি করেছেন। “রক্ত করবী” নাটকে প্রতীকের ছলে ধণী শ্রেণির সঙ্গে চিরন্তন দ্বন্দময়তা ও কৃষিজীবী কৃষ্টির ভবিষ্যতের আভাস সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। জমিদারি রক্তের ধারা নিস্তেজ করে, সুনিপুণ মমতায় পাশে দাঁড়িয়েছেন অবহেলিত কৃষক প্রজার। তখনকার কৃষকরা ছিল নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, নিরন্ন, অত্যাচারিত। প্রজাদের কষ্ট কবির মনের দেয়ালে বার বার আন্দোলিত করেছে। 

তাই তিনি বলেছেন “আমার জন্মগত পেশা জমিদারী, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারী। এ কারণেই জমিদারীর জমি আকড়ে থাকতে আমার প্রবৃত্তি নেই। এ জিনিসটার পরে আমার শ্রদ্ধার একান্ত অভাব। জমিদারী ব্যবসায় আমার লজ্জা বোধ হয়। আমার মন আজ উপরের তলার গদি ছেড়ে নীচে এসে বসেছে। দুঃখ এই যে, ছেলে বেলা থেকে পরজীবী হয়ে মানুষ হয়েছি”। পল্লী গ্রামের জনজীবনের অন্তহীন উপাদান এবং ভূমিহীন কৃষকের জীবনের করুন শৈল্পিক চিত্র “শাস্তি” “দুর্বুদ্ধি” ও “সমস্যাপূরণ” গল্পে তুলে ধরেছেন। সর্বোপরি কৃষকরা ছিল নিতান্ত গরিব। ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ছিল গতানুগতিক। ফলে ফসল উৎপাদন কম হতো। খাজনা পরিশোধ করার মত অবস্থা হতো না। ফলে সব সময়ই অত্যাচারে নির্যাতিত হতো। প্রতিনিয়ত এসব নির্মমতা রবি ঠাকুর স্বচক্ষে উপলব্দি করতে পেরেছেন।

কবি গুরু বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানের প্রতিটি রহস্যই যেন একটি বীজ। বীজের অভ্যন্তরে যেমন সুপ্ত চারা বা সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কৃষক মাটির বুক চিরে সেই বীজ রোপণ করে। সুনিবিড় পরিচর্যা, পরম মমতা আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একটি নতুন চারা গজায়। অত:পর ফুলে ফলে ভরে তুলে। সৃষ্টি হয় সুনির্মল ধরণী। আর যদি কাজ না করে তা হবে নিরর্থক। রহস্য আজীবন রহস্যই থেকে যাবে। তাই তিনি দৃপ্তকন্ঠে বলেছেন-“আমাদের দেশের চাষের জমির উপর সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানের আলে ফেলিবার দিন আসিয়াছে। আজ শুধু একলা চাষীর চাষ করিবার দিন নাই। আমাদের  তাহার সাথে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হবে। আজ লাঙ্গলের ফলার সাথে আমাদের মাটির সংযোগ যথেষ্ট নয়। সমস্ত দেশের বুদ্ধির সঙ্গে, অধ্যবসায়ের সাথে তাহার সংযোগ হওয়া চাই”। রবিঠাকুর চেতনার গভীরে লালন করতেন “কৃষিই বাংলার কৃষ্টি”।

সিকেএ/বিডি