eibela24.com
বুধবার, ১৯, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
যে বাঙালি নারীর চাবুক থেকে রক্ষা পায়নি ধর্মান্ধরা
আপডেট: ০৪:২৩ pm ১৬-০৬-২০১৮
 
 


ঘোড়ার পিঠে চেপে চাবুক হাঁকাতেন। মুখে জ্বলত একটার পর একটা সিগারেট। ব্রিটিশ মদতপুষ্ট কয়লা খনির দালাল-গুণ্ডা যারাই ধর্মের জিগির তুলে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইত তাদের দিকে হিম চোখে তাকাতেন। ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত দুষ্কৃতিদের। বেগতিক দেখলে ঝলসে উঠত সেই মহিলার চাবুক। তখন মার খেয়ে পিঠটান দেওয়া ছাড়া আর কীই বা করার থাকে। এই বাঙালি মহিলার এই রুদ্রাণী রূপে ভরসা পেতেন সাধারণ মানুষ। জন্ম শতবর্ষ কবেই পার হয়েছে। এমন দুরন্ত সাহসী মহিলার নাম বিমলপ্রতিভা।

পশ্চিমবঙ্গের কয়লা শহর রানিগঞ্জের মাটিতে ধর্মান্ধতার জিগির তুলে গোষ্ঠী সংঘর্ষ ও তাকে ঘিরে এখন চরম বিতর্ক চলছে। অথচ এই শহর ও কয়লা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষ জানেন শ্রমই হলো আসল ধর্ম। এই পরম্পরা নিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটাচ্ছেন রানিগঞ্জবাসী। যেখানে সর্বধর্ম সমন্বয়ই বারবার প্রাধান্য পেয়ে এসেছে।

স্বাধীনতার আগে রানিগঞ্জেই বারে বারে সম্প্রীতিকে নষ্ট করার একাধিক চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ মদতপুষ্ট বিভিন্ন কয়লা খনির দালাল ও ঠিকাদাররা। আর তাদেরই বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই চাবুক চালাতেন বাঙালি মহিলা বিমলপ্রতিভা দেবী। তার কথা লেখা আছে, শ্রমিক আন্দোলন সংক্রান্ত ইতিহাসের পাতায়। বিমলপ্রতিভা, এক স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা অবিস্মরণীয় নারী। ঠিক যেন সিনেমার পর্দার সেই ‘হান্টারওয়ালি’ নায়িকা৷

বিমলপ্রতিভার জন্ম ১৯০১ সালে কটক শহরে। সেখানকার স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত মুখোপাধ্যায় পরিবারে। বাবা সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় বিমলপ্রতিভা সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পরে বিয়ে হয় কলকাতার এক বনেদি রক্ষণশীল পরিবারে। তবে রক্ষণশীলতার বাঁধন কেটে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বিমলপ্রতিভা। এই কাজে তার সহকর্মী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বোন উর্মিলা দেবী।

কড়া ধাঁচের বিমলপ্রতিভার কাজে আকৃষ্ট হয় ভারত নওজোয়ান সভা। এই সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন ভগৎ সিংয়ের অনুরোধে বাংলা প্রদেশের চেয়ারপার্সন তথা শীর্ষ পদে ছিলেন বিমলপ্রতিভা। দুই বিপ্লবীর চিন্তাধারার মিল ছিল বেশি। সেই সূত্রে গোপনে সশস্ত্র পথের বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন বিমলপ্রতিভা। ১৯২৮ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসে। ১৯৪০ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন অসম সাহসী এই মহিলা। রাজনীতিকভাবে নরমপন্থায় তার বিশ্বাস ছিল না৷ এরপরেই শুরু হয় বিকল্প পথে দেশের স্বাধীনতায় অংশ নেওয়ার পালা। মহিলা শাখার কাজ ছেড়ে সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে আকৃষ্ট হন বিমলপ্রতিভা। শুরু হয় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। ১৯৪১ সালে তাকে গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়টাই জেলে কাটিয়েছিলেন বিমলপ্রতিভা। ১৯৪৫ সালে মুক্তি পেয়েই তিনি সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কলকাতা থেকে অনেক দূরে দামোদর নদ তীরবর্তী বর্ধমানের আসানসোল, বার্নপুর, রানিগঞ্জ হয় তার কর্মক্ষেত্র।

আর এখানেই শুরু বিমলপ্রতিভা দেবীর জীবন ঘিরে রোমাঞ্চকর অধ্যায়। খনি-শিল্পাঞ্চলের রুক্ষ পরিবেশে তার মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের বধূ যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোড়া চড়ে চাবুক হাঁকাতেন তা ক্রমে গল্পের আকার নিতে শুরু করে। প্রকাশ্যে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে, তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে শ্রমিক বস্তিতে ঘোরা। আর শ্রমিকদের সংঘটিত করে ব্রিটিশ বিরোধী ভাষণ দেওয়ায় তার জুড়িদার কেউ ছিলেন না।

রানিগঞ্জের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কয়লা কুঠির শহরে প্রবল অত্যাচার চালাত বিভিন্ন কুঠির মালিক পক্ষ। এদের সবাই ব্রিটিশ ও ভারতীয় অংশীদার বা সম্পূর্ণ ব্রিটিশ সংস্থা। সেখানেই ধর্মনিরপেক্ষ সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলন করতেন বিমলপ্রতিভা দেবী। তাকে রুখতে বহু ছক করা হয়েছিল। কিন্তু কে দাঁড়াবে অমন হন্টারওয়ালি মর্দানির সামনে। ফলে যারা কিছু টাকার লোভে হামলা চালাতে যেত, তাদের চাবুকে ঠাণ্ডা করতেন বিমলপ্রতিভা। শুধু কয়লাখনির শ্রমিকদের মধ্যেই নয়, রেল শহর আসানসোলের রেল শ্রমিকদের মধ্যেও বিরাট জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। ফলে তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী বিশাল শ্রমিক সংগঠন।

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত আরসিপিআই রাজনৈতিক দলের শ্রমিক শাখার দায়িত্ব নিয়েই আসানসোল-রানিগঞ্জ-বার্নপুরে এসেছিলেন বিমলপ্রতিভা৷ স্বাধীনতার কিছু আগে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মধ্যেও অবিচল ছিলেন এই নারী নেত্রী। প্রকাশ্যেই ধর্মান্ধদের চাবকে ঠাণ্ডা করেছিলেন। সেই কথা ভেসে বেড়ায় কয়লা শহরের বাতাসে। অকুতোভয় এই নারী মারা যান ১৯৭৮ সালে।


বিডি