eibela24.com
শুক্রবার, ১৬, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
সংখ্যালঘুদের নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
আপডেট: ০৭:৪৭ pm ১০-০৭-২০১৮
 
 


সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটা রাজনৈতিক দলের উন্নত বিশ্বের একটি শাখা এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ইষ্ট দেবতার নাম উচ্চারণপূর্বক আমাদের জাতির পিতাকে অপমান করেন। অবশ্য এ ঘটনাটিতে আমাদের দেশের সর্বমহলে যতটা নিন্দা ও প্রতিবাদ হওয়া দরকার ছিল তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও হয়নি; যা অত্যন্ত হতাশাজনক! তবে উক্ত ঘটনাটি সরকারের স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ এ ঘটনাটি হয়তো এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর দলটির রাজনৈতিক দর্শনগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা হয়তো সময়ের পালাবদলে দাবানল আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যার অন্যতম উপযুক্ত কাল এদেশের জাতীয় এবং বিভিন্ন নির্বাচনকালীন বা পরবর্তী সময়। সকল  সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে আবার শুরু হচ্ছে নির্বাচন মৌসুম।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও আক্রমণের চিত্র পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাবো এ নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনাই সংগঠিত হয়েছে নির্বাচনকালীন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে। উদাহরণস্বরূপ— ১৯৭০-এর নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামীলীগের জয়লাভ এবং তারপর ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে পাক-বাহিনীর নির্বিচারে সংখ্যালঘুদের হত্যাযজ্ঞ; ১৯৯০-এর অক্টোবরে আবার আক্রান্ত হয় সংখ্যালঘুরা, উদ্দেশ্য দেশের গণআন্দোলন স্থবির করা; ২০০১-এর নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতার শিকার হয় এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তখন পূর্ণিমা-সীমাদের আহাজারি কি কেউ শোনেননি? অতঃপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনপরবর্তী হামলার ঘটনাও সুবিদিত। যশোর অভয়নগরের মালোপাড়ার সে ঘৃণ্য ঘটনাই মহাকালের সাক্ষী! এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নানা ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ নির্যাতন যেন নিত্য ঘটনা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিরাগত কোন শক্তির প্রভাব কল্পনা করে থাকেন এবং এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তারা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলেরই আস্থাভাজন বলে বিশ্বাস করে থাকেন। ফলে এ চিন্তা-চেতনা থেকেই তারা এ সম্প্রদায়ের উপর মনে ক্ষোভ ফুঁসে থাকেন, যার প্রতিফলন বিভিন্ন সময়ে তাদের কর্মকাণ্ডে ফুটে ওঠে। তাই এ সকল সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কালো হাত রুখে দিতে রাষ্ট্রকে এখনি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রবাদ আছে— ‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে টাস টাস।’ এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ- খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ তাদের বিভিন্ন বিভাগীয় সম্মেলনে আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঠিক প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাও করছেন। এ বৈঠকে তারা নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা এবং নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে মঠ-মন্দির-মসজিদ-গির্জা ব্যবহার নিষিদ্ধ, নির্বাচনী প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বিবৃতিদানকারী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল এবং নির্বাচনের পূর্বাপর সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোর দাবি জানিয়েছেন। এছাড়াও সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে আরো কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। সেগুলো নিম্নরূপ— “এক. সংখ্যালঘুদের নিয়ে এ মৃত্যুখেলা বন্ধ করতে মৌলবাদী সন্ত্রাসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ হতে বিরত রাখাপূর্বক দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান প্রনয়ন করা এবং সংখ্যালঘুদের মাতৃভূমিতে বাঁচার ন্যায্য হিস্যা দেয়া। দুই. মহান জাতীয় সংসদ সহ দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোতে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করতে নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ দেয়া। তিন. প্রয়োজনে ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করে সংখ্যালঘুদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হওয়া এবং নির্ভয়ে তাদের মাতৃভূমিতে বেঁচে থাকার ন্যায্য অধিকার প্রদান করা। চার. ধর্মীয় বিশৃঙ্খলায় উসকানি দেয়া ভুয়া অনলাইন আইডি বা সাইট বন্ধ করা এবং এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। যাহাতে সাধারণ মানুষ মৌলবাদীদের ভ্রান্ত প্ররোচনায় অনুপ্রাণিত না হয়। পাঁচ. ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার এবং মানুষদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করা।
ছয়. রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা আইন পাস করা এবং ধর্মীয় সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশ বাহিনীতে আলাদা একটি সেল গঠন করা, যাঁরা সর্বদা সংখ্যালঘু নির্যাতনের উপর দৃষ্টি রাখবেন এবং কোথাও এ সমস্যা তৈরি হতে দিবেন না। সাত. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন করা। এছাড়া মিডিয়াতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। যেমন: ধর্মীয় উসকানিমুলক কোন গুজবে কান না দেয়া প্রসঙ্গে বিভিন্ন চ্যানেলে নাটিকা প্রদর্শন করা।” 

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার মাটিতে দিনের পর দিন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ে কাজ করছে এক কুচক্রী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। তাই আজ দেশের বিবেক তথা সরকারের নিকট এ নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াসে এ লেখাটি। বাংলাদেশের কোনো সংখ্যালঘুই স্বেচ্ছায় তাদের প্রেয়সী মাতৃভূমিকে ছাড়তে চায় না। কিন্তু তারপরও কেন তারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর গড়ে ০.৫% হারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আর এভাবে চলতে থাকলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এ সোনার বাংলার মাটি থেকে শেষ সংখ্যালঘুর অস্তিত্বটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। পশ্চাতে নিভৃতে কেঁদেই যাবে স্বপ্নচারী ৩০ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের স্বপ্ন!

                     
লেখক- সহযোগী সম্পাদক ‘মাসিক তারুণ্য’, বিএসএস(সম্মান), শেষ বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।


বিডি