eibela24.com
বুধবার, ২৬, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
উল্টো রথযাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন
আপডেট: ০৯:৪০ pm ২২-০৭-২০১৮
 
 


আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হয়ে নয় দিনব্যাপী চলে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব। আষাঢ়স্য দ্বিতীয়ায়ং রথং কুর্যাদবিশেষতঃ।/ আষাঢ়শুক্লৈকাদিশ্যাং জপ হোম মহোত্সব। (পদ্মপুরাণ) অর্থাত্ আষাঢ় মাসের দ্বিতীয়ায় রথযাত্রা অনুষ্ঠান করে শুক্লা একাদশীর দিন উল্টোরথ বা পুন:যাত্রা করতে হবে। এই সময়ে জপ, হোম করা বিধেয়। আজ সেই উল্টো রথযাত্রা উত্সব। শুধু জগন্নাথ দেবেরই রথযাত্রা নয়, ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে বিভিন্ন রথের কথা পাওয়া যায়। ভাদ্র মাসে সূর্যের রথযাত্রা, চৈত্র মাসে শিবের রথযাত্রা, বুদ্ধের রথযাত্রা, কার্তিক মাসে দেবীর রথযাত্রা, কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রা, শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা ইত্যাদি। রং ধাতুর অর্থ ক্রীড়া করা, এর সাথে ছত্রত্রয় যুক্ত হয়ে হয় 'রথ'। শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীমতী রাধার কুঞ্জে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু পথে চন্দ্রাবলী আটকে দিল। ফলে দেরি হয়েছিল বলে শ্রীমতী রাধার কাছে যাওয়ার পর প্রসঙ্গত বলেছিল—'দেহ রথে যদি না-ই এলে প্রভু, মনোরথে কেন এলে না?' আমরা আমাদের মনোরথকে নিয়ে যাব শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের উল্টো রথযাত্রায়। 

রথ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয় বৈশাখী অক্ষয় তৃতীয়ায়, শেষ হতে ৫৮ দিন লাগে। জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ত্রিমূর্তিকে স্নান করানো হয়। একে বলা হয় স্নানযাত্রা। সে সময় দারুব্রহ্ম বিরূপ আকৃতি হয়। নিরোধন গৃহে (দরজা বন্ধ রেখে) নবযৌবনদানের কাজ চলে। বলা হয় অনবসর বা জ্বর হয়েছে। ১৬তম দিনে তারা দর্শন দেন। এরপর নবরস আস্বাদনের জন্য ভক্ত সঙ্গে মিলিত হয়ে রথে চড়ে গুণ্ডিচায় গমন করেন। রথযাত্রায় ভগবান ভক্তের সঙ্গে মিলিত হন। বিভিন্ন ব্যস্ততায় যারা ভগবানকে দর্শনের সুযোগ পান না, শারীরিক কারণে দর্শন করতে পারেন না তাদেরকে নিজেই কৃপা করে দর্শন দেন। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে রথ যাত্রায় মন্দিরে প্রবেশ করেন। যাকে বলা হয় উল্টোরথযাত্রা। আমাদের জানা প্রয়োজন শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব কে? জগন্নাথ—জগতের নাথ। 'যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই জগন্নাথ'। 'জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথগামী ভবতু মে' এখানে স্বামী মানে ঈশ্বর বা প্রভু, জগতের নাথ-জগন্নাথ। কিন্তু তাঁর হস্তপদ নেই। এ বিষয়ে আমাদের সর্ববৃহত্ পুরাণ স্কন্দ পুরাণের উত্কলখণ্ডে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। প্রভু রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে স্বপ্নে দেখালেন—আমি হস্তপদ রহিত হলেও অপ্রকৃত হস্তাদি দ্বারা ভক্তের সেবা গ্রহণ করব এবং বিশ্বজগতের কল্যাণ সাধন করব। তুমি পূজা কর। তখন স্বয়ং ব্রহ্মা, রাজার অনুরোধে প্রীত হয়ে ঐ মূর্তিতে চক্ষু ও প্রাণদান করেন এবং নিজে পুরোহিত হয়ে মূর্তি প্রতিষ্ঠাপূর্বক পূজা করেন। হস্তপদাদি না থাকায় তাকে 'ঠুটো জগন্নাথ' বলা হয়ে থাকে। সেটা অজ্ঞতা মাত্র। রথযাত্রায় সহজলভ্য ফল কলা এবং অন্যান্য ফলাদি আস্ত-ই ছুঁড়ে দেয়া হয়। স্বয়ং জগন্নাথ রথযাত্রায়, ভক্ত সঙ্গে থাকেন বলে 'সকলের মধ্যে আমিও প্রসাদ গ্রহণে অধিকারী' হিসেবে আস্ত ফল ছুঁড়ে দেয়া হয়। আর তা এমনিই প্রসাদ হয়ে যায়। নিবেদনের প্রয়োজন হয় না। 

ঐতিহাসিক তথ্যমতে, অনঙ্গভীমদেব ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার রথযাত্রা উত্সবের প্রচলন করেন। পুরীর রথযাত্রার পরে বাংলাদেশের ধামরাইয়ের যশোমাধবের রথযাত্রা উপমহাদেশ বিখ্যাত।

রথযাত্রার গূঢ় রহস্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন—"রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম/ ভক্তেরা লুটিয়ে পথে করিছে প্রণাম।......" কঠোপনিষদে আছে—'রথে তু বামনং দৃষ্ট্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে'। অর্থাত্ রথের উপরে জগন্নাথকে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। এ কারণেই মানুষ রথ দেখতে যায়। রথের রশি ধরে টান দেয়। রথ চালনা বা রথের রশি ধরাতেই তো পূজা। 

রথযাত্রার পুণ্যে আমাদের সবার আত্মা মুক্তির রাজ্যে পৌঁছুক। শান্তিতে থাকুক সকলে। প্রণাম জানাই : নীলাচল নিবাসায় বিদ্যায়ঃ পরমাত্মনে।/বলভদ্র সুভদ্রাহ্যানং জগন্নাথায়তে নমোঃ

লেখক : সরকারি চাকরিজীবী; দফতর সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি

ইমেইল : dasgourmohan@yahoo.com