eibela24.com
বৃহস্পতিবার, ২০, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
নড়াইলে জেলেদের মাছ শিকারে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ভোঁদড়!
আপডেট: ০৭:৫৯ pm ২৭-০৭-২০১৮
 
 


নড়াইলের জেলেদের কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য প্রায় ২০০ বছর ধরে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে গোয়ালবাড়ী গ্রামের শচীন বিশ্বাস, গুরুপদ বিশ্বাস আর পাগল চান বিশ্বাসের পরিবার। প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ১০টি নৌকা আর ভোঁদড় নিয়ে নদীতে পাড়ি দেন তারা। বছরের এ সময়টা যা আয় হয়, তা দিয়েই চলতে হয় সারা বছর। 

একসময় নদীতে যথেষ্ট পানি থাকায় সুন্দরবন পর্যন্ত চলে যেতেন চিত্রাপাড়ের এ জেলেরা। চিত্রায় প্রচুর মাছও পাওয়া যেত। এখন পানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দস্যুদের ভয়ে সুন্দরবন না গিয়ে চিত্রার পাশের মধুমতি, আড়িয়ালখাঁ পাড়ি দিয়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর পর্যন্ত যান। কিন্তু এখন আর ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরে দিন চলে না। তাই মাছ ধরা ছেড়ে খামারিদের কাছ থেকে মাছ কিনে বাজারে বিক্রি করেন অনেকে। অনেকে কাজের সন্ধানে চলে গেছেন ভারতে। ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার নড়াইলের জেলেদের কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরতে ভোঁদড়ের সহায়তা নেন জেলেরা। কিন্তু নানা কারণে নদী-নালা, খাল-বিলে মাছ কমে যাওয়ায় এ ধরনের জেলের সংখ্যা দিন দিন কমছে। বর্তমানে হাতেগোনা যে কয়েকটি জেলে পরিবার মাছ ধরার জন্য ভোঁদড় পালন করছে, তারাও পেশা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছে। জেলেদের এ দুর্দিনে দেশের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ভোঁদড়ও পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে। 

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক যুগ আগেও নড়াইলে খাল, বিল, নদীতে ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করে পাঁচ শতাধিক জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। তখন জেলায় হাজার খানেক ভোঁদড় ছিল। জেলার পাঁচ-ছয়টি গ্রামে এখনো এ আদি পদ্ধতিতে অনেকে মাছ শিকার করে। নড়াইল সদরের কলোড়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ী, ঘোড়াখালী, রতডাঙ্গা; তাড়াশি কালিয়া উপজেলার বাউনখালী, গাজিরহাট ও হাড়িয়ার ঘোপ গ্রামে অর্ধশতাধিক পরিবার ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ গ্রামগুলোয় এখন ভোঁদড় আছে ৮০-৯০টি। জেলেরা বলছেন, নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেয়া, দেশী প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি, মাছ চাষ বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক উৎস কমে যাওয়া, নদীতে পাট পচানোর কারণে জলাশয় বছরের দু-তিন মাস মাছ শূন্য থাকা, ভোঁদড়ের দাম বৃদ্ধি, সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত এসব কারণে ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা জেলের সংখ্যা কমে গেছে। নড়াইল সদরের কলোড়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ী গ্রামে এক যুগ আগেও অন্তত ২০০ জেলে পরিবার ছিল। তারা সবাই ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করত। বর্তমানে এ গ্রামে জেলে পরিবার শখানেকের বেশি হবে না। তাছাড়া তাদের মধ্যে সাকুল্যে ২২-২৩টি পরিবার ভোঁদড় পোষে। 

এ গ্রামের জেলে রমেন বিশ্বাস জানান, বাপ-দাদাদের ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরতে দেখেছেন। তিনিও ২৫-২৬ বছর এভাবে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু আট বছর হলো আর ভোঁদড় পালন করেন না। কারণ তাতে আর পোষায় না। তবে বাপ-দাদার পেশাকে এখনো আঁকড়ে আছেন রবিন বিশ্বাস, ভবেন বিশ্বাস, সুশান্ত বিশ্বাস, দ্রুপ বিশ্বাস, শ্যাম বিশ্বাস তুষার বিশ্বাসসহ কয়েকটি পরিবার। 

তারা জানান, এখন আর কেউ এভাবে মাছ ধরতে চায় না। ভোঁদড় পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। একটি ভোঁদড় কিনতে এখন ১২-২০ হাজার টাকা লাগে। যেখানে একটি নৌকায় কমপক্ষে দুটি ভোঁদড় লাগে, ছয়টি হলে ভালো হয়। আবার প্রতিটিকে দৈনিক অন্তত এক কেজি মাছ খেতে দিতে হয়। 

সুশান্ত বিশ্বাস জানান, বছর দশেক আগে তারা দল বেঁধে তিন-চার মাসের জন্য মাছ ধরতে ভোঁদড় নিয়ে সুন্দরবনে চলে যেতেন। কিন্তু একাধিকবার দস্যুদের কবলে পড়ার পর আর সুন্দরবনে যান না। নদীতে পাট পচানোর কারণে মাছ মরে যায়। পরবর্তী দু-তিন মাস আর মাছ পাওয়া যায় না। ওই সময় তাদের কোনো আয়-উপার্জন থাকে না, কিন্তু ভোঁদড়কে ঠিকই মাছ কিনে খাওয়াতে হয়। 

এদিকে জেলার মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা জেলেদের সম্পর্কে জানলেও তাদের ব্যাপারে আলাদা কোনো নজর নেই কর্তৃপক্ষের। এ জেলেদের ব্যাপারে সরকারের আলাদা কোনো নীতি না থাকায় মৎস্য বিভাগ জানান,  জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তাছাড়া বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ভোঁদড়ের ব্যাপারেও সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। যদিও বিচিত্র এ পেশা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানতে এখনো নড়াইলে বিদেশীদের আগমন ঘটে।

ইউআর/বিডি