eibela24.com
শনিবার, ১৭, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
কৃত্তিকা ত্রিপুরা আমাদেরই মেয়ে
আপডেট: ০৯:০৪ pm ০৯-০৮-২০১৮
 
 


জোবাইদা নাসরীন

বন্ধুরা পোস্ট করেছে বাংলাদেশকে নিয়ে কৃত্তিকা ত্রিপুরার লেখা, ছবি। কৃত্তিকা লিখেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাস নিয়ে। ছোট্ট কচি হাতের লেখা। নিজের ভাষায় হয়তো লিখতে পারেনি। বাংলা ভাষাতেই প্রকাশ করেছে দেশের প্রতি তার ভালোবাসা। এই বাংলাদেশের জমিনে তারও অংশ ছিল। কিন্তু ছোট্ট ১১ বছরের মেয়েটি একবারের জন্যও হয়তো টের পায়নি, এই দেশটি আসলে তার নয়। সে এই দেশে পুরুষতন্ত্রের কাছে একটি পণ্য, ক্রোধ প্রকাশের জায়গা। পাহাড়জুড়েই স্কুল-শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবি জানাচ্ছে তাদের দেখা-অদেখা সহপাঠীর জন্য। কিন্তু তাদের প্রতিবাদ মিডিয়া পর্যন্ত আসে না হয়তো। কারণ হতে পারে, মিডিয়ার পাঠক-দর্শকদের বেশিরভাগই বাঙালি। কোথায় কোন ত্রিপুরা মেয়ে মারা গেছে, সে খবর অনেকেই জানতে হয়তো আগ্রহী নন।

‘আদিবাসী’ বিষয়টি আমাদের মাথায় এখনও সেভাবে ঢুকাতে পারিনি। একচ্ছত্র জাতীয়তাবাদী মন থেকে বের হতে পারলেই ‘আদিবাসী’ বিষয়ে আমাদের চেতনা ও জিজ্ঞাসা জারি রাখতে পারবো। আমরা আরও যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখবো কৃত্তিকা হত্যার দাবিতে যত মিছিল-বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে, সেখানে স্থানীয়দের থেকে সমর্থন খুব বেশি নেই। কারণ, আমাদের কাছে এখনও ‘আদিবাসী’ নারীনিপীড়ন একটি ‘স্থানীয় ই্স্যু’,তাই এখানে বাঙালিরা খুব একটা যায় না। যেভাবে নারীর ওপর নিপীড়ন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী ইস্যু হয়।

‘নারীদের প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র’। নারীদের প্রতি সহিংসতার মধ্যে আছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপহরণ ও পাচার।  ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন 'কাপেং ফাউন্ডেশন'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নারীদের প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র’। গত বছর ৪৮টি ঘটনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর  ৫৮ জন নারী ও মেয়েশিশু যৌন বা শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়। ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৮টি ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, ২০টি সমতলে। আর এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ৬৮ জন অপরাধীর মধ্যে ৫৪ জনই বাঙালি, চারজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। ২০১৭ সালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যে নয় নারী হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের ছয়জনই পাহাড়ি। বাকি তিনটি ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জ, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলায়। ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ২৩ জন ‘আদিবাসী’ নারী ধর্ষণ, হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টাসহ নানা ধরনের যৌনহয়রানি ও হামলার শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ময়মনসিংহ, রাঙামাটি ও ঢাকায় ৪ জনকে হত্যা, দু’জনকে ধর্ষণের পর হত্যা, দু’জনকে গণধর্ষণ, ৭ জনকে ধর্ষণ, ৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা ও ৩ জনকে যৌন হয়রানি করা হয়।

কাপেংয়ের আরও একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮ সালে একজন নারী হত্যার শিকার হন। এরপরের বছর হত্যার শিকার হন চারজন নারী। ২০১৬ সালে হত্যার শিকার হওয়া নারীর সংখ্যা ছিল ছয়। আর গত বছর এই সংখ্যা ছিল নয়। অর্থাৎ নারীনিপীড়ন বাড়ছেই।

দুর্বৃত্তরা কৃত্তিকাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তার ওপর করেছে নৃশংস নির্যাতন। এরপর বাড়ির পাশে পাহাড়ের নিচে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। কীভাবে এত ছোট একটি মেয়ের প্রতি এতটা আক্রোশ থাকতে পারে? কত সাম্প্রদায়িকতার বীজ ধর্ষকের মনে থাকলে শুধু ধর্ষণ করেই তার রাগ কমনি, মেয়েটিক হত্যা করেছে। ২০১১ সালে উত্তরবঙ্গে সাঁওতাল নারী মরিয়ম মুর্মুকে ধর্ষণ করা হলো, তারপর তাকে হত্যা করা হলো, তারপরেও ক্রোধ যায়নি ধর্ষক-হত্যাকারীদের। তার উলঙ্গ লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সবাইকে দেখানোর জন্য। এই দেখানো মানেই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মহড়া, সবচেয়ে ক্ষমতাশীল মতাদর্শের আস্ফালন।

কৃত্তিকার খবরটি যখন পড়ছিলাম, তখন ফিরে গিয়েছিলাম ইতি চাকমার কাছে। ইতি ও কৃত্তিকা একই এলাকার মেয়ে। সে এলাকায় আমি দীর্ঘদিন ছিলাম। ইতি যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন মেয়েটি মাত্র তিন বছরের। আমাকে দেখলে ভয় পেতো। কারণ আমি বাঙালি। আদালতে ধর্ষককে দেখে ছোট্ট মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ওর মা আমাকে জানিয়েছিল মেয়েটি সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকছে। অচেনা বাঙালি দেখলে মায়ের কোল থেকে নামতে চায় না।

আমরা জানি, যেকোনও দেশে সহিংসতায় সবার আগে টার্গেট হয় নারী। বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ডিসকোর্সের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত আছে ভূমি দখলের রাজনীতি। একসময় প্রচলিত স্লোগান ছিল ‘গারো মেয়ে এবং জমি চাই’। কারণ, গারো সমাজ মাতৃসূত্রীয়, সেখানে মেয়েরাই সম্পত্তির মালিকানা পায়। বেশ কিছু বাঙালি ছেলে গারো মেয়েকে বিয়ে করে জমি লিখিয়ে নিয়ে সেই মেয়েদের ছেড়ে চলে গেছে। গত বেশ কয়েক বছরে সেসব এলাকাগুলোয় যদি সাম্প্রদায়িক হামলার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাবো, সব সময়েই নারীকে আঘাত করা হয়, যেন সেই পরিবার কিংবা পুরো কমিউনিটি ভয়ে এলাকা থেকে চলে যায়।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন—বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নারীরা বিভিন্নভাবে প্রান্তিক। তারা জাতি, লিঙ্গ, ভাষা ও ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু। তার সঙ্গে আছে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সামাজিক প্রান্তিকতার অনুষঙ্গ। তবে একইসঙ্গে সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, নারী কোনও সমগোত্রীয় ক্যাটাগরি নয়। এরমধ্যে রয়েছে বহুমাত্রিকতা পাটাতনিক বিভাজন।

পাহাড় বা সমতলে নারীনিপীড়ন নতুন নয়। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, কৃত্তিকার পরে আরও দুটো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো মিডিয়াতে একবারেই আসেনি। এই পাহাড় থেকেই অপহরণ হয়েছিলেন আমার বন্ধু কল্পনা চাকমা। ভূমি লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন গারো নারী গিদিতা রেমা।

আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে ইতিহাসকে। এই নারীরাই এই উপমহাদেশে প্রথম স্লোগান তুলেছিল, ‘জান দেবো তবু ধান দেবো না’ এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ইতিহাস ও প্রান্তিকতা বিচারে তাই নারী নিপীড়ন ভিন্নভাবে বিশ্লষণের দাবি রাখে।

জোবাইদা নাসরীন
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নি এম/