eibela24.com
শুক্রবার, ২১, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২
নাজিরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার
আপডেট: ১১:১২ am ১১-০৮-২০১৮
 
 


৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কার্যক্রম শুরু না করেই বিল উত্তোলন করে নিল ইউএনও ঝুমুর বালা। 
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং প্রকল্পের নীতিমালা ও শিডিউল মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। 

নীতিমালায় ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঘর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু না করেই প্রকল্পের বরাদ্দে টাকা ৩০ জুনের আগেই উত্তোলন করে নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। অথচ প্রকল্পের নীতিমালায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করতে না পারলে বা কিছু অংশ বাকী থাকলে অবশিষ্ট টাকা ৩০ জুনের আগেই চালানের মাধ্যমে কোষাগারে জমা দিয়ে চালান কপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণের বিধান রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর নাজিরপুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ও নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঝুমুর বালা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে এসব অনিয়ম করছেন। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি), উপজেলা প্রকৌশলী, পিআইওসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ ওই কমিটির সদস্য। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাজের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। অথচ এখনো ১শ’ ৮৯টি ঘরের মধ্যে একটিরও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। ৩ আগস্ট শুরু হওয়া আরসিসি পিলার তৈরির কাজ বর্তমানে চলছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা যায়, ওই প্রকল্পের অধীন নাজিরপুর উপজেলায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে একটি প্রকল্পের অনুকুলে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘরের জন্য এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়। এ বরাদ্দ থেকে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ১৬টি করে মোট ১ শ’ ৪৪ টি ঘর নির্মাণ করা হবে। অন্য একটি প্রকল্পে আলাদাভাবে উপজেলার ৯নং কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের জন্য আরো ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। ওই প্রকল্পে ৪৫ জনের একটি নামের তালিকাও রয়েছে যাদের প্রত্যেককে একটি করে ঘর নির্মাণ করে দেয়ার কথা রয়েছে। তালিকায় থাকা একাধিক ব্যাক্তির সাথে কথা হলে তারা জানান, তারা এখনো ঘর পাননি। তবে তালিকাভুক্তির জন্য প্রত্যেকের কাছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ উপজেলায় এখনো আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ কর্মসূচীর ঘর তৈরী শুরু হয়নি। তবে পিআইও অফিস থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের জন্য প্রতি ইউনিয়ন থেকে ৯ টি করে নামের তালিকা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ‘এ প্রকল্প নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে মিটিং করেছে ইউএনও ও পিআইও। ওই মিটিংয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ১৬টির পরির্বতে প্রথমে ১৪টি করে ঘর দেয়ার কথা বলা হলেও এখন ৯টির তালিকা নেয়া হয়েছে। গত সোম ও মঙ্গলবার ওই তালিকা যাচাই-বাচাইয়ের করা হয়েছে।

আশ্রয়ন প্রকল্প নীতিমালায় পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কাজটি করার কথা। কিন্তু পিআইসির সভাপতি একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের লোককে সাবকন্ট্রাক্টর নিয়োগ করে তার মাধ্যমে ঘরের পিলার তৈরীর কাজ করাচ্ছেন। শিডিউলে ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি টিনের ঘরে ১২টি, বারান্দায় পাঁচটি ও ল্যাট্রিনে চারটি পিলার দেয়ার নিয়ম রয়েছে। ঘরের জন্য চার বর্গফুটের পিলারের উচ্চতা ১২ ফুট, বারান্দা ও ল্যাট্রিনের পিলারের উচ্চতা ১০ ফুট। পিলার হবে মেশিনে তৈরী। পিলারে থাকবে ছয় এমএম গ্রেড রড (চারটি)। কিন্তু গ্রেড রডের বদলে কম পরিমাপের নন- গ্রেড রড ব্যবহার করা হচ্ছে। পিলালের রড বাঁধাইয়ে রিং (চুড়ি) হিসেবে রডের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে ৮ নম্বর জিআই তার। নাজিরপুর উপজেলা সদরের ডাকবাংলোর সামনে পিলারের কাজ চলছে। তাতে প্রথম শ্রেণির বদলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া (ডাস্টসহ) দিয়ে পিলার বানানো হচ্ছে। পিলার ঢালাই শেষে মাটিতে ফেলে ওপরে পুরনো চটের মাধ্যমে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত পানি দেয়ার (কিউরিং) কথা। কিন্তু কিউরিংয়ে চটের বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে না, পর্যাপ্ত পানিও দেয়া হচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা শেষ হওয়ায় দায়সারাভাবে পিলার তৈরির কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

সরেজমিনে পিলার তৈরীর কাজ দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা চাঁদ আলীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা ডেলি চুক্তিতে ২২জন লেবার এখানে কাজ করছি। আমাদের সকলের বাড়ী পাবনায়। সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে বাগেরহাটের বাবুল হোসেন কাজ করাচ্ছেন। আমরা তার নির্দেশনা অনুযায়ি কাজ করছি।

উপজেলার শ্রীরামকাঠী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উত্তম কুমার মৈত্র বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য হলেও সার্বিক বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কাজের নীতিমালা ও শিডিউল আমাকে দেওয়া হয়নি। তাছাড়া আমার ইউনিয়নে এখনো এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। তবে পিআইও অফিস থেকে ইউনিয়নের ৯ ওয়ার্ড থেকে ৯টি নামের তালিকা প্রেরণ করতে বলা হয়েছে।

নাজিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন খান বলেন, ৪৫টি ঘর আসার বিষয়টি আমি শুনেছি তবে ১শ’ ৪৪ টির ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। তাছাড়া আমি এ বছর হজে যাওয়ার নিয়ত করেছি তাই কয়েকমাস ধরে ইউএনও ও পিআইও অফিসের কোন খোঁজ রাখছি না। সেখানে বর্তমান হরিলুট চলছে। তারা তাদের খেযাল খুশি মত যা ইচ্ছা তাই করছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইরফিল আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রকল্পে আলাদা আলাদা ভাবে ১ কোটি ৪৪ লাখ ও ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, জুনের শেষের দিকে আমরা বরাদ্দের টাকা পেয়েছি। সেক্ষেত্রে ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কোন সুযোগ না থাকায়, বরাদ্দের টাকা তুলে অন্য একাউন্টে রাখা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ৯টি করে ঘর দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে চেয়ারম্যানদের কাছে তালিকা নেয়া হয়েছে। ইউনিয়নে ৯টি করে ঘর দিলে ৮১টি হয়, তাহলে বাকী ঘরগুলো কি হবে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বাকী গুলো যাচাই বাচাই করে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দেয়া হবে।

নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঝুমুর বালা বলেন, এ উপজেলায় মোট ১ শ’ ৯০টি ঘর দেয়া হবে। ইতোমধ্যে কাজও শুরু করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে শিডিউল, নকশা মোতাবেক কাজ করা হচ্ছে। এতে অনিয়মের সুযোগ নেই। কাজ শেষ হতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।

নি এম/কল্যান