eibela24.com
বুধবার, ০২, ডিসেম্বর, ২০২০
 

 
সুপ্রিমকোর্টেও ন্যায় বিচার পাননি ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী ১৩ মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা
আপডেট: ১০:১২ pm ২৬-০৯-২০২০
 
 


শংকর মৈত্র

১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় সামরিক আদালতে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেও ন্যায়বিচার পাননি অভিযুক্তরা। সামরিক আদালতের বৈধতা নিয়ে করা রিট হাইকোর্ট খারিজ করে দেওয়ার পর প্রধানবিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চে আপিল করা হয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে পাঁচ দিন শুনানি করে তা খারিজ করে সামরিক আদালদের দণ্ড বহাল রাখা হয়। দণ্ডিতদের আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির বাসভবনে গিয়ে রিভিউ আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রধানবিচারপতি তা শুনেনতো না – ই বরং পত্রপাঠে বিদায় করে দিয়ে বলেছিলেন, রাজনীতিকে আদালতে টেনে আনবেন না।

ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পর প্রশ্ন ওঠছে, মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের প্রহসনমূলক বিচারে ফাঁসির যে দণ্ড দেয়া হয়েছিল,যে আইনবহির্ভূত বিচার হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিকার চেয়েও পান নি কেনো? কোন ভয়ে ভীত ছিলেন বিচারকরা?একজন নাগরিক, সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের জীবন রক্ষায় কেনো ব্যর্থ্য হয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত?

মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের নামে ফাঁসির দায় তখনকার সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকরা এড়াতে পারেন না। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না, এমনটাই বলছেন অনেক বিশ্লেষক।

লেখক ও গবেষক আনোয়ার কবির, যিনি এই ঘটনার গভীর অনুসন্ধান করে বই লিখেছেন, তথ্যচিত্র বানিয়েছেন তিনি তার বইয়ে অভিযুক্তদের স্বজন ও বিশিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা ছিল হীন পরিকল্পনার অংশ। আর এই পরিকল্পনার মূলে ছিলেন জেনারেল এরশাদ, যিনি তখন ছিলেন সেনাপ্রধান। এরশাদ তার সামনের পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতেই সুযোগ কাজে লাগান। জিয়াউর রহমানের হত্যার পর ক্ষমতায় বহাল থাকে বিএনপিই। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। যার কাঁধে বন্দুক রেখে এরশাদ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

এরশাদের নির্দেশে সামরিক আদালত সৃষ্টি করে মাত্র ১৮ দিনে শেষ করা হয় বিচার। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে বসানো হয় সামরিক আদালত। আদালতের বিচারকরাও ছিলেন জেনারেল এরশাদের পছন্দের নিয়োগপ্রাপ্ত। সামরিক আদালতের সভাপতি ছিলেন, মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান, সদস্য ছিলেন ব্রিগেডিয়ার নুসরাত আলী কোরেশী, কর্নেল মোহাম্মদ মতিউর রহমান, কর্নেল মফিজুর রহমান চৌধুরী, লেঃ কর্নেল মাসুদ আলী খান, লেঃ কর্নেল এম মকবুল হায়দার, ও লেঃ কর্নেল মোহাম্মদ হারিস। এই পাঁচ জনের মধ্যে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কর্নেল মতিউর রহমান বীরপ্রতীক, বাকি চার কর্মকর্তাই ছিলেন পাকিস্তান প্রত্যাগত । ৪ জুলাই সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ সেনাআইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী এই সামরিক আদালত গঠনের নির্দেশ নেন।

এর আগেই মেজর জেনারেল মেজাম্মেল হোসেনকে প্রেসিডেন্ট করে কোর্ট অব ইনকোয়ারী কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্য ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হাফিজউদ্দিন, কর্নেল গোলাম কাদের ও কর্নেল আজিজুর রহমান।

সামরিক আদালত ও কোর্ট অব ইনকোয়ারির সদস্য সবাই ছিলেন এরশাদের পছন্দের। কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে অভিযুক্ত করা হয়েছিল ৩৩ জনকে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে ১৯৮১ সালের ১০ জুলাই কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে সামরিক আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। ১০ জুলাই আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর সে দিনই রহস্যজনক কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। ১৬ জুলাই পুনরায় শুরু হয় বিচারকার্যক্রম। সামরিক আদালতে সরকার পক্ষে ডিফেন্ডিং অফিসার বা আইনজীবী নিযুক্ত হন ব্রিগেডিয়ার নাজিরুল আজিজ চিশতি,কর্নেল এ এম এ আমিন ও লেঃ কর্নেল আবু নঈম আমিন আহমেদ। আর আসামী পক্ষে ডিফেন্ডিং অফিসার নিযুক্ত হন ব্রিগেডিয়ার এম আনোয়ার হোসেন,কর্নেল মোহাম্মদ আইনউদ্দিন ও লেঃ কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম।

অভিযুক্ত ব্রিগেডিয়ার মোহসীনউদ্দীন বীরবিক্রম, কর্নেল এম এ রশিদ বীরপ্রতীক ও মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদারের পক্ষে এডভোকেট গাজীউল হক ও এডভোকেট আমিনুল হককে নিয়োগ দেয়ার জন্য তাদের স্বজনরা সামরিক আদালত কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন। এডভোকেট আমিনুল হক চট্টগ্রাম গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে এ আবেদন করেন। কিন্তু তাদের আবেদন নাকচ করে দেয়া হয়। শুরু হয় একতরফা বিচার কাজ। মাত্র ১৮ দিনেই বিচারকাজ শেষ করা হয়। ২৮ জুলাই বিচারকাজ শেষ করে ২৯ জুলাই আসামিদের বিভিন্ন কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১১ আগস্ট রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদন্ড, ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং অন্যদের সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়।

কোর্ট মার্শালের এই রায়ের বৈধতা নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর (১৯৮১) হাইকোর্টে রিট করা। রিটে বলা হয়েছিল সামরিক আদালতে এই বিচার কার্যক্রম চলতে পারে না। শুনানি শেষে ৭ সেপ্টেম্বর তা খারিজ করে দেন বিচারপতি এ এম ফয়সুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি লকিফুর রহমানের বেঞ্চ। এর বিরুদ্ধে এই দিনই প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চে আপিল করা হয়। আপিল বিভগের পূর্নাঙ্গে বেঞ্চে অন্য বিচারপতিরা ছিলেন বিচারপতি রুহুল ইসলাম বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন,এম এইচ খন্দকার,এডভোকেট সিরাজুল হক, ড. কামাল হোসেন,ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ,এডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ ও ড. এম জহির। ১৭ সেপ্টেম্বর শুনানি শুরু হয়। ২২ সেপ্টেম্বর সেই আপিল নাকচ হয়ে যায়। বহাল থাকে সামরিক আদালতের রায়। দুপুরে আপিল নাকচ হলে রাতেই শীর্ষ আইনজীবীরা প্রধানবিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের বাসভবনে যান রায় পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ এর জন্য। প্রধানবিচারপতি সেই রিভিউ একবাক্যে নাকচ করে দিয়ে রাজনীতিকে আদালতে না আনার পরামর্শ দেন। রিভিউ নাকচ হওয়ার পরপরই রাত ১২ টার পর অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন কারাগারে থাকা ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। আর এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয় ইতিহাসের আরেক কলঙ্কিত দিনের।

একই অভিযোগে ১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আরও এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তিনি হলেন লেঃ কর্নেল শাহ মোহাম্মদ ফজলে হোসেন। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধিন ছিলেন। কিন্তু তাকেও পরবর্তিতে ব্রিগেডিয়ার মফিজুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট করে মার্শাল কোর্টে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর।

যে বীর সেনানীরা জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেন মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই মিথ্যা অপবাদে প্রহসনের বিচারে তাদের ফাঁসিতে ঝুলে জীবন দিতে হলো। আর এর পেছনে কুটচাল ও হীন পরিকল্পনা করলেন তিনি, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন পাকিস্তানে। এইচ এম এরশাদ, যিনি দেশ স্বাধীনের পর ফিরে এসে হয়ে ওঠলেন দৌর্দণ্ডপ্রতাপশালী সামরিক কর্মকর্তা। জেনারেল জিয়া হত্যার পর জেনারেল এরশাদ প্রতিটা সুযোগ কাজে লাগান তার ক্ষমতা আরোহণে। কখনো রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে আবার কখনোবা সর্বোচ্চ বিচারালয়কে ব্যবহার করে।

নি এম/