eibela24.com
সোমবার, ২১, জুন, ২০২১
 

 
ইজ্জত আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা
আপডেট: ১১:৩৭ pm ২০-১২-২০২০
 
 


পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক হাসপাতালে এক তরুণ পাকিস্তানী অফিসারকে আনা হয়েছিলো মানসিক চিকিৎসা করানোর জন্য। সেই তরুণ বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর গুরুতর মানসিক সমস্যায় পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে সে একাই হত্যা করেছিলো ১৪ হাজারের বেশী মানুষ। জি চৌদ্দ হাজার!

.দিনের পর দিন ব্রাশফায়ারে হত্যা করতে করতে সে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। যুদ্ধের কথা মনে হলেই গোটা শরীরে তার ভয়ংকর খিঁচুনি শুরু হতো আর ঘুমাতে গেলেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখতো সে। কে যেন তাঁকে বলছে আবার ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশে, আবার হিন্দুদের চিরতরে শেষ করে দিতে হবে। এছাড়া ওর মুক্তি নেই।

.সূত্র- পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবের লেখা বই "Glimpses into the corridors of power" তিনি এই লেখার সূত্র হিসেবে নিয়েছিলেন বাবা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ২৫ যে মার্চ রাত থেকেই স্কুল কলেজের মেয়েদের ধরে আনতো হানাদারেরা। ট্রাকে তুলে এনে পছন্দ মত মেয়েদের টেনে হিঁচড়ে নামাতো! প্রকাশ্যে এদের পোশাক খুলে গাছের আড়ালে, দেয়ালের পাশে ধর্ষণ করতো! ধর্ষণ করার পরে হেড কোয়ার্টারের চার তলায় নিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় লোহার রডের সাথে চুল শক্ত করে বেঁধে পুনরায় শুরু করলো নির্যাতন!

শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ছেলেদের ধরে আনলো। কারো পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হতো, কারো মুখে গরম পানি ঢালা হতো! কারো হাত পায়ে গিট মেরে গুড়িয়ে ফেলা হতো!

.পরাদেশী নামে একজন ডোম শাঁখারী পট্টির এক বাড়িতে যান। ঐ বাড়ি থেকে অপরূপ সুন্দরী একটি মেয়ের লাশ তুলে আনেন! মেয়েটির স্তন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে! যৌনাঙ্গ সম্পূর্ণ রূপে থেতলানো! মুখ বাহু উরুতে জমাট বাঁধা রক্ত! সমস্ত শরীরে কামড়ের চিহ্ন! তিনি আরো বলেন, আরমানিটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের এক ফুটফুটে মেয়ের কথা! মেয়েটির সম্পূর্ণ শরীর ক্ষতবিক্ষত! নরপশুরা মেয়েটিকে ধর্ষণ শেষে দুদিক থেকে পা ধরে নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলেছে!

কদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খবর আসে, এক মেজরের কাছে! মৃত মানুষের গন্ধে থাকা যাচ্ছেনা! অবিলম্বে লাশ তুলে ফেলা হোক! এ পর্যন্ত তারা শুধু শহরেই লাশ তোলার কাজ করে যাচ্ছিলো!

এ সংবাদ পাওয়ার পর চুন্নু, পরদেশী, রনজিৎ, মধুরাম, দুখিরাম সহ আরো কয়েকজন ডোম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়! প্রথমে তারা রোকেয়া হলে প্রবেশ করে! কিন্তু হলের কোনো কক্ষেই লাশ ছিলোনা! কেননা ২৫শে মার্চ রাতেই হলে অবস্থানরত ছাত্রীদের পাকিরা তুলে নিয়ে যায়!

এসময় তারা হলের চারতলার ছাদে গিয়ে দেখতে পান সেখানে অনেকগুলো ছাত্রীর লাশ ছড়ানো ছিটানো! তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই! অথচ এরা মরলো কিভাবে? এই প্রশ্নের জবাবে এক সৈন্য বলে, এদেরকে আমরা উপভোগ করেছি! তারপর যৌনাঙ্গে বেয়নেট ঢুকিয়ে হত্যা করেছি! এদের কারো পরনে কোনো কাপড় ছিলোনা! তাদের আশেপাশে দুএকটা সেলোয়ার কামিজ ছিলো!

রাবেয়া খাতুন কাজ করতেন রাজারবাগ ক্যান্টিনে! তিনি বলেন, "তিনি দেখতে পান ট্রাকে এবং জিপে করে প্রায় পঞ্চাশ জন মেয়েকে আনা হয়েছে! এদেরকে একটি কক্ষে রাখা হলো! প্রায় প্রত্যেকের হাতে বই খাতা ছিলো!

একদল সেনা কুকুরের মতো হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের উপর! প্রথমে জানোয়ার গুলো সমস্ত মেয়েদের পরনের কাপড় খুলে উলঙ্গ অবস্থায় সবাইকে মাটিতে শুয়ে পড়তে নির্দেশ দিলো! নির্দেশ অমান্য করলে লাথি মেরে ফেলে ধর্ষণ করেছিলো! তিনি বলেন প্রতিটি মেয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিলো! যোনিপথে বেয়নেট ঢুকিয়ে তাদের হত্যা করা হয়!"

সূত্র- ডোম পরাদেশী, চুন্নু, রনজিৎ, মধুরামের সাক্ষ্য/ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র।

সুসান ব্রাউনি মিলার নামের এক গবেষক লিখেছিলেন,"কোনো কোনো মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছে। "ধর্ষিতা মেয়েরা চিৎকার করে আমাদের বলতেন 'আমরা তো মরে যাব, আপনারা যদি কেউ বেঁচে যান তাহলে আমাদের কথা আমাদের বাড়িতে গিয়ে বলবেন।'... পাকিদের নির্যাতনের ধরন ছিল বীভৎস। তারা মেয়েদের স্তন কেটে ফেলত, যৌনাঙ্গে রাইফেল ঢুকিয়ে গুলি করত; এমনভাবে নির্যাতন করত যে সে প্রক্রিয়া আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না, এসব আমি নিজের চোখে দেখেছি।"- ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা একে এম আবু ইউসুফের ভাষ্য‌।

"পাকিস্তানী সেনারা প্রত্যেক মহিলাকে অবর্ণনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে ধর্ষণ করে। এরপর তাদের হত্যা করে। ধোপা যেভাবে কাপড় কাচে সেভাবে রেললাইনের ওপর মাথা আছড়ে, কখনও দু'পা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে দু'টুকরা করে হত্যা করেছে শিশুদের। স্বাধীনতার অনেকদিন পরেও সেখানে মহিলাদের কাপড়, ক্লিপ, চুল, চুলের খোঁপা ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে আমি আমার ছোট বোনের ফ্রকের এক টুকরো কাপড় খুঁজে পাই। সূত্র- নীলফামারীর বিনোদ কুমারের সাক্ষ্য।

টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের ছাব্বিশা গ্রামের মানুষ বেগম বলেছিলেন, "আমাদের পাশের বাড়ির একটি মেয়ে। সদ্য মা হয়েছে, আট দিনের বাচ্চা কোলে। ঐ সময় সে বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াচ্ছিলো। এমন সময় বাড়িতে আক্রমণ। ঘরে তখন কেউ ছিলো না। এরপর যা হবার তাই হলো, মেয়েটির উপর চলল অমানসিক নির্যাতন। এরমধ্যেই দুপুর গড়িয়ে এল, পাকিরা খাবার খেতে চাইল। ঘরে কিছু না থাকায় ক্ষেত থেকে বেগুণ এনে দিতে বলল। ভীত মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটির আসতে দেরি হচ্ছিলো দেখে পাকিরা তার বাচ্চাকে গরম ভাতের হাঁড়িতে ছুঁড়ে দিয়ে ঘর থেকে নেমে গেল।"

মুক্তিযুদ্ধের মার্চ মাসে মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি না হলে প্রথমে বাবা এবং ছেলে কে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সাথে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।"

নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার নিজে আত্মহত্যা করেন। সূত্র- পাকিস্তানী জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজার লেখা "A Stranger in My Own Country"

খুলনার একটি ক্যাম্প থেকে কাচের জারে ফরমালিনে সংরক্ষিত রাখা মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায় যা খুব নিখুঁতভাবে কাঁটা ছিলো। এটা পুরোটাই ছিলো পাকিস্তানি সেনাদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে। তারা পরখ করতো মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেমন!

আমাদের সংস্থায় আসা ধর্ষিত নারীদের প্রায় সবারই ছিল ক্ষত-বিক্ষত যৌনাঙ্গ। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিড়ে ফেলা রক্তাক্ত যোনিপথ, দাঁত দিয়ে ছিড়ে ফেলা স্তন, বেয়োনেট দিয়ে কেটে ফেলা স্তন-উরু এবং পশ্চাৎদেশে ছুরির আঘাত নিয়ে নারীরা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসতো।" - মালেকা খান/ সমাজকর্মী।

এক টর্চার সেলের প্রায় ১০ হাজার বাঙ্গালীকে নির্যাতন করেছিলো পাকিস্তানীরা। যার ফলে সেই মেঝেতে ৩ ইঞ্চি উঁচু রক্তের জমাট বেঁধে গিয়েছিলো।

কর্ণেল নাদির আলী নামের এক পাকিস্তানী অফিসার লিখেছিলেন, ১৯৭৩ সালে আমি ছয় মাস পাগলাগারদে ছিলাম। আমি কেন পাগল হয়ে গেলাম? আসলে আমি সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের সামষ্টিক অপরাধবোধে ভুগছিলাম, যে গণ-অপরাধ ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যেই বন্ধ করা উচিত ছিল।’ সূত্র - khaki dissident on 1971 by Colonel Nadir Ali.

বিজয় এতো সহজে আসেনি! বিজয় কেবল রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে আসেনি! বিজয় এসেছে বহু ভয়ংকর অধ্যায়ের পরে। এমন লাখ লাখ ভয়াবহতার পর!

মুক্তিযুদ্ধ স্রেফ কেবল একটি যুদ্ধ না তো; মুক্তিযুদ্ধ একটা জাতির জন্ম পরিচয়, প্রতিটি মাধ্যম। কি করে ভুলি এতো এতো আত্মত্যাগ? মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতম অধ্যায়গুলো কী এড়ানো আসলেই সম্ভব?

নি এম/