eibela24.com
শনিবার, ১৭, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
দিনাজপুরে এক হাজার বছর প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরের সন্ধান, চলছে খনন
আপডেট: ০৯:৪৫ pm ১৯-০৬-২০১৬
 
 


দিনাজপুর:: কাহারোল উপজেলার ১নং ডাবর ইউপি মাধবগাওয়ে প্রত্নস্থান খনন করে দশম থেকে একাদশ শতক সময়কালের একটি বিষ্ণু মন্দির উন্মোচিত হয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে এই খনন কাজ পরিচালিত হচ্ছে বলে খনন দলের পরিচালক  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেন জানান।

বর্তমানে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী বগুড়া মহাস্থানগর হতে ১৩ জন দক্ষ শ্রমিক ও স্থানীয় ২৬ জন শ্রমিক কাজ করছেন।

প্রায় দেড় মাস যাবৎ খননে যে  স্থাপনাটি উন্মোচিত হয়েছে সেটি একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যকার পূর্ব ভারতীয় হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে খনন দলের শিক্ষকেরা জানান। দিনাজপুর শহর থেকে কাহারোল উপজেলার জয়নন্দহাট রোড থেকে যে রাস্তাটির দক্ষিণ দিকে টংকরাবুর হাট নামে একটি  বাজার দক্ষিণ দিক থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে পাওয়া যায় মাধবগাঁও গ্রামটি।

রবিবার সকাল সাড়ে ১১ টায়  গিয়ে জানা যায়, স্থানীয় গ্রামের মানুষের কাছে এই উঁচু টিবিটি বুরুজ বলে পরিচিত। সেই  বুরুজটি খনন করেই খনন দলটি মন্দিরটির সন্ধান পেয়েছে বলে গ্রামবাসী জানান। মন্দিরটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম দিকে ১২ বাই ১২ মিটার পরিমাপের একটি নিরেট প্ল্যাটফর্মের ওপর ছোট একটি কক্ষ।

খনন দলের সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. স্বাধীন সেন জানান, একটি মন্দিরের গর্ভগৃহ হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রতিমার উপাসনা হতো। মন্দিরের বহির্গতের অভিক্ষেপের সংখ্যার ওপরে ভিত্তি করে পাঁচটা অভিক্ষেপ থাকলে বলা হয় পঞ্চরথ সাতটা থাকলে বলা হয় সপ্তরথ। কিন্তু আবিষ্কৃত মন্দিরটির নয়টা রথ থাকায় এটিকে নবরথ মন্দির বলা হয়।

তিনি আরও বলেন, মন্দিরটির প্রধান প্রবেশদ্বার পূর্বে দিকে একটি বর্গাকার নিরেট প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এই প্রবেশপথ চিহ্নিত। তিনি জানান, এর আগে একই খনন দল ২০০৬ সালে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় একটি পঞ্চরথ মন্দির খনন করলেও নবরথ বিশিষ্ট মন্দিরের আবিষ্কার বাংলাদেশে এই প্রথম।

অধ্যাপক স্বাধীন সেন জানালেন উন্মোচিত মন্দিরটির স্থাপনা রীতি ও গঠনশৈলী নিয়ে ইতিমধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও পূর্ব ভারতীয় স্থাপত্যের বিশেষজ্ঞ দীপক সঞ্জন দাশের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। উপরি কাঠামোকে বর্তমান পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলার বহুলড়ার সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, পূর্ব ভারতীয়, বিশেষ করে উড়িষ্যা মন্দির স্থাপত্যশৈলীর অন্তর্ভুক্ত এই মন্দিরটির গর্ভগৃহের ওপরে সুদৃশ্য ও সুউচ্চ রেখা দেউল ধরনের শিখর ছিল।

অধ্যাপক ডঃ স্বাধীন সেন এর মতে ইটের তৈরি বলে সুউচ্চ শিখরযুক্ত এই মন্দিরগুলোর শিখর একসময় ভেঙ্গে পড়ে। অবিভক্ত বাংলা অঞ্চল শহরসহ টিকে থাকা ইটের তৈরি এমন মন্দিরের সংখ্যা হাতে গোনা। অধ্যাপক সেন আরও জানান, প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা যায় যে, এটি একটি বিষ্ণু মন্দির ছিল। তিনি জানান, খনন কাজে উন্মোচিত অংশ দেখে ধারণা করা যায়, মন্দিরটি পুনরায় ব্যবহৃত হয়েছিল। অন্তত চতুর্দশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত।

খনন পরিচালক জানান, আরো দেড় মাস খনন কাজ  চলবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ গবেষক সোহাগ আলী জানান, আবিষ্কৃত মন্দিরটি বাংলাদেশের প্রত্ন স্থাপনার তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সংরক্ষণ করা স্বল্প ব্যয়ের মধ্যে সম্ভব। ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক ও রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালককে খনন সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের এই অংশে মন্দিরগুলো মানববসতির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল। ওই সময়ের নদী ব্যবস্থা ও  তার পরিবর্তনের সঙ্গে এই বসতিগুলোর বিকাশ, পরিবর্তন ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সম্পর্কিত বলে ধারণা করা যায়। খনন স্থলে কথা হলো উন্মোচিত মন্দিরটির লাগোয়া বাড়ির মালিক কৃষক অমৃত রায়ের সঙ্গে। তিনি বললেন, এত দিন এটা উঁচু একটা টিবি ছিল। জানার কোনো সুযোগ ছিল না নিচে কী আছে। খনন করার ফলে সুন্দর যে মন্দিরটি বেরিয়ে এসেছে, আমরা এলাকার মানুষ চাই সরকার এর উন্নয়ন এবং সংস্কার করবে।

স্থানীয় এলাকাবাসী সত্যরাম রায়, বয়স প্রায় ১০০ বছরের উপরে, তিনি শনিবার জানান, আমার দাদু বলেছিল এখানে পুরনো মন্দির ছিল।

প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর নকশা নির্মিত উন্মোচিত মন্দির দেখে বলা যায়, বর্তমানে এই অঞ্চল অবহেলিত হলেও একসময় সুন্দর উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল। মন্দিরটিকে এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন শতশত লোক আসছেন সেখানে।

 

এইবেলাডটকম/এমআর