eibela24.com
মঙ্গলবার, ১১, ডিসেম্বর, ২০১৮
 

 
মঞ্চাভিনেতা বিজন ভট্টাচার্যের ৩৯তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
আপডেট: ০৮:৩৯ am ১৯-০১-২০১৭
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী, নাট্যকার এবং মঞ্চাভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য ( জন্মঃ- ১৭ জুলাই, ১৯১৭ - মৃত্যুঃ- ১৯ জানুয়ারি, ১৯৭৮ )

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় ইংরেজ সৈনিক বৈমানিক বিল বাটলার বিজন ভট্টাচার্য রচিত 'নবান্ন' নাটকটি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি আবেগপূর্ণ চিঠি লিখেছিলেন নাট্যকারকে এবং ব্রিটেনের সংবাদপত্রে। ব্রিটেনসহ সারা পৃথিবী জানতে পারে- এদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ সম্বন্ধে। ব্রিটিশ সরকারের নীরবতায় ক্ষুব্ধ হয়ে সে দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানবতাবাদী নাগরিকদের বিভিন্ন সংবাদপত্রে একের পর এক লেখায় প্রকাশ পেতে থাকল পরিস্থিতির নির্মমতার কথা এবং তারই ফলে সৃষ্ট ব্যাপক জনমতের চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্‌স্টন চার্চিল বাধ্য হলেন ১৯৪৪-এর 'দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিশন' গঠন করতে। কমিশনের রিপোর্টেও প্রতিফলিত হল বিল ও অন্যান্য সহমর্মী নাগরিকদের ক্ষোভের কথা— 'বাংলাদেশের পনের লক্ষ দরিদ্র নরনারী যে সর্বনাশের সম্মুখীন হয়েছিল, তার জন্য তারা নিজেরা দায়ী ছিল না। সমাজ তার দরিদ্র মানুষগুলিকে বাঁচাবার কোন ব্যবস্থা করে নি। প্রশাসনিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গেই এসেছিল নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়।' 
কমিশন শুধু পরিস্থিতির বিশ্লেষণেই আবদ্ধ থাকেনি, বরং ঘটনার নেপথ্য কারণ হিসাবে প্রকারান্তরে ইংরেজ সরকারকেও দায়ী করেছিল— 'বাংলার মন্বন্তরের জন্য দায়ী যুদ্ধের স্বার্থে ইংরেজ সরকারের সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন ও কৃষকহত্যার নীতি, বেপরোয়া চোরাকারবার ও মজুতদারি।' 
পৃথিবীর ইতিহাসে কোন নাটকের দ্বারা সামাজিক বিপর্যয়ের পিছনে ক্ষমতাসীন সরকারের মুখোশ উন্মোচন করার এ ছাড়া দ্বিতীয় নজির মেলে না।

ফরিদপুর জেলার খানখানাপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ক্ষীরোদবিহারী ভট্টাচার্য ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। পিতার কর্মসূত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করার সুবাদে তিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন; ফলে তাদের সংগ্রামী জীবন ও আঞ্চলিক কথ্য ভাষার ছাপ তাঁর রচিত নাটকে পরিলক্ষিত হয়।

বিজন ভট্টাচার্য অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০-২২) যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। পরে কলকাতার আশুতোষ কলেজ ও রিপন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয় আন্দোলনে (১৯৩১-৩২) যোগ দেন এবং মহিষবাথানে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ফলে লেখাপড়ায় (বিএ) ছেদ পড়ে এবং ১৯৩৪-৩৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তিনি বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন।

বিজন ভট্টাচার্য কিছুদিন (১৯৩১-১৯৩২) আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করেন এবং ১৯৩৮-৩৯ সালে তিনি আলোচনা, ফিচার ও স্কেচ লেখার কাজ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি মাতুল সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের অরণি পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৪২ সালে সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এছাড়া তিনি ভারত ছাড় আন্দোলন, জনযুদ্ধ-নীতি প্রচার, ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘ স্থাপন এবং প্রগতি লেখক সঙ্ঘ এবং ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ।

বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যজীবনের শুরু হয় ১৯৪০ এর দশকে। প্রচলিত বাণিজ্যিক থিয়েটারের ধারার বাইরে স্বতন্ত্র নাট্য আন্দোলনের সূচনা করেন কিছু ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী গোষ্ঠী । এঁদেরই সাংস্কৃতিক শাখা ছিল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা ইণ্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েসন যা আইপিটিএ নামে বেশি পরিচিত। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন এই গণনাট্য সঙ্ঘের প্রথম সারির নাট্যকর্মী। চিন্তা, চেতনা এবং সংগ্রামের প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার দিশারী ছিল ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক রচনা, অভিনয় এবং নির্দেশনা সাফল্য লাভ করেছিল এই গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

গণনাট্য সঙ্ঘের (সেই সময় ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ) প্রথম নাটক আগুন বিজন ভট্টাচার্যের রচনা । এই নাটকটি ১৯৪৩ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে তাঁর লেখা নাটক জবানবন্দী এবং নবান্ন অভিনীত হয়েছিল। এই নাটকগুলিতে তিনি প্রধান অভিনেতা এবং নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৪৪ সালের ২৪ অক্টোবর শ্রীরঙ্গম মঞ্চে নবান্নের প্রথম অভিনয় হয়। এই নাটকটির পটভূমিকা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গণনাট্য আন্দোলন এবং বিজন ভট্টাচার্যের নাটক বাংলা নাটক রচনা এবং অভিনয়ের এক যুগবদলের সূচনা করে।

১৯৪৮ সাল থেকে গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে বিজন ভট্টাচার্যের মতান্তর ঘটে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ তিনি বোম্বাইতে হিন্দি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ১৯৫০ সালে তিনি আবার বাংলায় ফিরে আসেন এবং নিজের নাটকের দল ক্যালকাটা থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেও তিনি নাট্যকার, প্রধান অভিনেতা এবং নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। এই থিয়েটারে তাঁর রচিত নাটকের মধ্যে অন্যতম ছিল কলঙ্ক, গোত্রান্তর, মরাচাঁদ, দেবী গর্জন, গর্ভবতী জননী প্রভৃতি।
১৯৭০ সালে তিনি ক্যালকাটা থিয়েটার ছেড়ে দিয়ে কবচ-কুণ্ডল নামে নতুন দল গঠন করেন। এখানে তাঁর রচিত নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষ্ণপক্ষ, আজবসন্ত, চলো সাগরে, লাস ঘুইর‍্যা যাউক প্রভৃতি।

বিখ্যাত লেখিকা জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী মহাশ্বেতা দেবী বিজন ভট্টাচার্যের স্ত্রী। তাঁদের এক সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্য যিনি ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নবারুণ ভট্টাচার্য একজন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক এবং কবি।

বিজন ভট্টাচার্য মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কৃষক শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা ও বাঁচবার কথা তাঁর নাটকগুলির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে তিনি এই ভাবনা থেকে সরে যান। গণনাট্য সঙ্ঘ ত্যাগ এবং নিজের নাটকের দল একাধিক বার ভেঙে গড়ে তিনি তৈরি করেন। ক্রমে মার্কসীয় দর্শনের পরিবর্তে বা সঙ্গে তাঁর রচনায় লোকায়ত ধর্ম দর্শন, হিন্দু ধর্মের সমন্বয় প্রয়াসী মানসিকতা কাজ করেছিল। চিরকালীন মাতৃকা ভাবনা তাঁর নাটকে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়।

অভিনেতা হিসাবে বিজন ভট্টাচার্য অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। নানারকম চরিত্রকে মূর্ত করে তুলতে তিনি দক্ষ ছিলেন। নানা উপভাষার সংলাপ উচ্চারণেও তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চরিত্রের মধ্যে ছিল বেন্দা (জবানবন্দী), প্রধান সমাদ্দার (নবান্ন), পবন ও কেতকাদাস (মরাচাঁদ), হরেন মাস্টার (গোত্রান্তর), প্রভঞ্জন (দেবীগর্জন), মামা (গর্ভবতী জননী), কেদার (আজ বসন্ত), সুরেন ডাক্তার (চলো সাগরে) প্রভৃতি।
নাট্যনির্দেশক হিসাবেও তিনি সমান সফল ছিলেন। গণনাট্য সঙ্ঘে তাঁর নাটক জবানবন্দী এবং নবান্ন ছিল অসাধারণ দুটি প্রযোজনা। পরে তিনি তাঁর নিজের গ্রুপ থিয়েটারেও বহু নাটকের সফল প্রযোজক এবং নির্দেশক ছিলেন।

বিজন ভট্টাচার্যের লেখা নাটক 'নবান্ন' প্রথম অভিনীত হল শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যৌথ নির্দেশনায় ২৪ অক্টোবর ১৯৪৪-এ শ্রীরঙ্গম নাট্যগৃহে। প্রথম রজনীতে যাঁরা অভিনয় করেছিলেন তার মধ্যে প্রধান সমাদ্দারের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিজন ভট্টাচার্য স্বয়ং, সে রাতের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যে তালিকা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের স্যুভেনির থেকে পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়—
অভিনয়ে — বিজন ভট্টাচার্য (প্রধান সমাদ্দার), শম্ভু মিত্র (দয়াল ও টাউট), সুধী প্রধান (কুঞ্জ), জলদ চট্টোপাধ্যায় (নিরঞ্জন), গঙ্গাপদ বসু (হারু দত্ত ও বরকত), চারুপ্রকাশ ঘোষ (কালীধন ধাড়া), সজল রায়চৌধুরী (রাজীব), মণিকুন্তলা সেন (পঞ্চাননী), শোভা সেন (রাধিকা), তৃপ্তি ভাদুড়ী (বিনোদিনী), চিত্তপ্রসাদ হোড় (বরকর্তা), গোপাল হালদার (বৃদ্ধ ভিখারি), শম্ভু ভট্টাচার্য (ডোম) প্রমুখ। 
আবহসঙ্গীত - গৌর ঘোষ, মঞ্চাধ্যক্ষ - চিত্ত ব্যানার্জী, উপদেষ্টা - মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, পরিচালনা - শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্য।

রচিত নাটক
আগুন(১৯৪৩) 
জবানবন্দী (১৯৪৩)
নবান্ন (১৯৪৪)
জীয়নকন্যা (১৯৪৫)
মরাচাঁদ (১৯৪৬)
অবরোধ(১৯৪৭)
কলঙ্ক(১৯৫০)
জননেতা(১৯৫০)
জতুগৃহ(১৯৫২)
মাস্টারমশাই(১৯৬১)
গোত্রান্তর (১৯৬১)
ছায়াপথ (১৯৬১)
দেবীগর্জন (১৯৬৬)
কৃষ্ণপক্ষ (১৯৬৬)
ধর্মগোলা (১৯৬৭)
গর্ভবতী জননী (১৯৬৯)
আজ বসন্ত (১৯৭০)
লাস ঘুইর‍্যা যাউক (১৯৭০)

 

এইবেলাডটকম/প্রচ