eibela24.com
শনিবার, ২০, অক্টোবর, ২০১৮
 

 
স্মরণীয় অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের ৮৬তম জন্ম বার্ষিকী আজ
আপডেট: ০১:৫৭ am ০৭-০৪-২০১৭
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্মরণীয় অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন (জন্মঃ- ৬ এপ্রিল, ১৯৩১ - মৃত্যুঃ- ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪)

তাঁর জন্মগত নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। ১৯৬৩ সালে সাত পাকে বাঁধা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সুচিত্রা সেন "সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেস" জয় করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে। যখন চলচ্চিত্রজগতে সুচিত্রা সেনের আত্মপ্রকাশ তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত অভিবাসি ও উদ্বাস্তুর তুমুল স্রোতে শহুরে ভদ্রলোক সমাজে পাশ্চাত্ব মনোভাব তেমন করে দানা বাঁধতে পারে নি; বাঙালীদের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ তখনও ঐতিহ্যকে আঁকরে ধরে রেখেছে। ফলত, আদর্শ নারীর গুণাবলী অপরিবর্তীত রয়ে গেছে পুরুষ-শাসিত সমাজে। সৌভাগ্যক্রমে সুচিত্রার পরিচালকেরা, যেমন অগ্রদূত (বিভূতি লাহা, ও সহযোগী), যাত্রিক, অজয় কর, নির্মল দে, প্রভৃতি এই আদর্শ নারীর চরিত্রেই সুচিত্রা সেনকে উপস্থাপন করলেন। যে ছবিটি সুচিত্রা সেনকে সাধারণের কাছে প্রসিদ্ধি আনলো, সেটা হল অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)। শোনা যায়, ২০০৫ সালে তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল; কিন্তু সুচিত্রা সেন জনসমক্ষে আসতে চান না বলে এই পুরস্কার গ্রহণ করেননি। ২০১২ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গবিভূষণ প্রদান করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষা
জেলা সদর পাবনায় সুচিত্রা সেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন এক স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী।
১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। তাঁদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী। ১৯৫২ সালে সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত হন।

চলচ্চিত্র জীবন
১৯৫২ সালে শেষ কোথায় ছবির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি।
উত্তম-সুচিত্রা জুটি
উত্তম কুমারের বিপরীতে সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স-অফিসে সাফল্য লাভ করে এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটি উপহারের কারনে আজও স্মরনীয় হয়ে আছে। বাংলা ছবির এই অবিসংবাদিত জুটি পরবর্তী ২০ বছরে ছিলেন আইকন স্বরূপ।
সম্মাননা
১৯৫৫ সালের দেবদাস ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেন, যা ছিল তার প্রথম হিন্দি ছবি। উত্তম কুমারের সাথে বাংলা ছবিতে রোমান্টিকতা সৃষ্টি করার জন্য তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিনেত্রী। ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকে তার অভিনীত ছবি মুক্তি পেয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে গেছেন, যেমন হিন্দি ছবি আন্ধি। এই চলচ্চিত্রে তিনি একজন নেত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। বলা হয় যে চরিত্রটির প্রেরণা এসেছে ইন্দিরা গান্ধী থেকে। এই ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং তার স্বামী চরিত্রে অভিনয় করা সঞ্জীব কুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতেছিলেন। হিন্দি চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর দাদাসাহেব সম্মাননা প্রদান করে ভারত সরকার। চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এ সম্মাননা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব সম্মাননা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। সম্মাননা নিতে কলকাতা থেকে দিল্লি যেতে চাননি বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।

অন্তরীন জীবন
১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এর পর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য সুচিত্রা সেন মনোনীত হন, কিন্তু ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নিতে দিল্লী যাওয়ায় আপত্তি জানানোর কারনে তাকে পুরস্কার দেয়া হয় নি।
মৃত্যু
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শেষকৃত্যে গান স্যালুট দেবার কথা ঘোষণা করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী-পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী সুচিত্রা সেনের মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠান।
পরিবার
তার মেয়ে মুনমুন সেন এবং নাতনী রিয়া সেন ও রাইমা সেন ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
চলচ্চিত্রের তালিকা
সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)
ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪)
অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)
শাপমোচন (১৯৫৫)
সবার উপরে (১৯৫৫)
সাগরিকা (১৯৫৬)
পথে হল দেরি (১৯৫৭)
হারানো সুর (১৯৫৭)
দীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯)
সপ্তপদী (১৯৬১)
বিপাশা (১৯৬২)
চাওয়া-পাওয়া
সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩), এজন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন
হসপিটাল
শিল্পী (১৯৬৫)
ইন্দ্রাণী (১৯৫৮)
রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮)
সূর্য তোরণ (১৯৫৮)
উত্তর ফাল্গুনি (১৯৬৩) (হিন্দিতে পুনঃনির্মিত হয়েছে মমতা নামে)
গৃহদাহ (১৯৬৭)
ফরিয়াদ
দেবী চৌধুরানী (১৯৭৪)
দত্তা (১৯৭৬)
প্রণয় পাশা
প্রিয় বান্ধবী
পুরস্কার ও সম্মাননা
বছর পুরস্কার/সম্মাননা ফলাফল চলচ্চিত্র
১৯৬৩ ৩য় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব - শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী জয়ী ১৯৬৩-এর চলচ্চিত্র সপ্তপদী

১৯৬৬ ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার মনোনীত মমতা
১৯৭২ পদ্মশ্রী
চলচ্চিত্র শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য
১৯৭৬ ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার মনোনীত আঁধি

২০১২ বঙ্গবিভূষণ
চলচ্চিত্রে সারা জীবনের অবদানের জন্য

 


রুপালি পর্দার প্রিয়তারকা জুটি উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্ক বাস্তবে কেমন ছিল তা এখনো প্রশ্নবোধক হয়েই আছে। বাঙালির মনের দীর্ঘ দিনের এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর বের করা সম্ভব নয়। তবে যে কারণে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল তা এখানে তুলে ধরেছেন সাকিবুল হাসান

সেকালে উত্তম-সুচিত্রাকে অনুসরণ করতে চাননি, এমন প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল মেলা ভার। যৌবনে কতজন হয়তো রিনা ব্রাউনের মতো প্রেমিকের বাইকে বসে চলে যেতে চেয়েছে ‘সপ্তপদী’র দেশে। অনেকেরই ধারণা ছিল উত্তম-সুচিত্রা রুপালি পর্দার মতো ব্যক্তিগত জীবনেও বিবাহিত। 
১৯৫৪ সালে সুচিত্রা সেনকে অভিনয় ছাড়তে বলেছিলেন স্বামী দিবানাথ সেন। কারণ উত্তম কুমারের সঙ্গে রোমাঞ্চের সম্পর্ক। আসলেই কি উত্তম-সুচিত্রা জুটির মধ্যে ব্যক্তি রসায়ন ছিল। এ ধোঁয়াশা ঘেরা প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে ফেরেন ভক্তরা। ১৯৫৩ সালে এই জুটির প্রথম ছবি 'সাড়ে চুয়াত্তর' মুক্তি পেয়ে হিট হয়। প্রথম ছবিতেই দর্শক তাদের পর্দার মতো বাস্তব জীবনেও প্রেমিক যুগল ভাবতে থাকে। এই ভাবনা জোরালো হয় ১৯৫৪ সালে। ওই বছর মুক্তি পায় তাদের ছয়টি ছবি। প্রতিটি ছবিতেই জীবনঘনিষ্ঠ অভিনয়ের কারণে দর্শকের মনে উত্তম-সুচিত্রার প্রেমের কল্পকথা জোরালো হতে থাকে। তবে দর্শকের অন্ধবিশ্বাসের মূলে জল ঢালেন সুচিত্রা নিজেই। ওই বছর মুক্তি পায় 'অগ্নি পরীক্ষা'। এ ছবির পোস্টারে লেখা ছিল- 'আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হলো অগ্নিপরীক্ষা'। এ লেখার নিচে ছিল সুচিত্রার স্বাক্ষর। এই পোস্টার দেখে অঝোরে কেঁদেছিলেন উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী। অন্যদিকে এর আঁচ ছড়িয়েছিল সুচিত্রার দাম্পত্য জীবনেও। উত্তম-দিবানাথের সম্পর্কের অবনতি এখান থেকেই শুরু। স্বামীর জোরালো সন্দেহের কারণে ওই বছর চুক্তিবদ্ধ হওয়া আরও চারটি ছবিতে কাজ করতে পারেননি সুচিত্রা। স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও অভিনয় ছাড়তে রাজি হননি মহানায়িকা। বাড়তে থাকে ঝগড়-ঝাটি, সঙ্গে সন্দেহের তীর। মদে আসক্ত হয়ে পড়লেন দিবানাথ।
সুচিত্রা সেনকে চিত্রজগতের সবাই মিসেস সেন বলে ডাকতেন। কিন্তু উত্তম কুমার ডাকতেন রমা নামে।
আর উত্তম কুমারকে রমা ডাকতেন 'উতো' বলে। দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকায় মেয়ে মুনমুনকে সুচিত্রা পাঠিয়ে দেন দার্জিলিংয়ে কনভেন্টে পড়তে। ১৯৫৭ সালে উত্তম কুমার 'হারানো সুর' প্রযোজনা করলেন। নায়িকা হতে বললেন সুচিত্রা সেনকে। উত্তম প্রযোজনা করছেন শুনে সুচিত্রা সেন বললেন, 'তোমার জন্য সব ছবির ডেট ক্যান্সেল করব।' হলোও তাই। এতে আরও ক্ষেপলেন দিবানাথ।
এক দিন সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাসায় পার্টি ছিল। উত্তম কুমার 'ব্ল্যাক ডগ' হুইস্কি পছন্দ করতেন। তাই ছিল মদের বিশাল আয়োজন। পার্টিতে ছিলেন উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরিদেবী, প্রোডিউসার রত্না চ্যাটার্জি।
তখন মধ্য রাত। উঠে পড়লেন উত্তম-সুচিত্রা। শুরু হলো টুইস্ট ডুয়েল নাচ। উত্তম কুমার সুচিত্রার কোমরে হাত দিয়ে নাচছেন বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েই।
মাথা ঠিক রাখতে পারলেন না দিবানাথ সেন। হঠাৎ দিবানাথ ছুরি নিয়ে তাড়া শুরু করলেন উত্তম কুমারকে। পার্টি লণ্ডভণ্ড। সুচিত্রার বাড়ির অলিন্দে ছুটছেন উত্তম কুমার। পেছনে ছুরি হাতে সুচিত্রার স্বামী! একসময় উত্তম কুমারকে ধরে ফেললেন দিবানাথ সেন। হাতজোড় করে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাতর প্রার্থনা করছেন উত্তম কুমার।
আর দিবানাথ সেন বলে চলেছেন, 'উত্তম আই উইল কিল ইউ', 'আই উইল কিল ইউ'। থামালেন গৌরিদেবী। কোনো মতে দিবানাথ সেনকে নিরস্ত্র করলেন। উত্তম কুমার ছাড়া পেয়ে ছুটতে শুরু করলেন। থামলেন! প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়িতে পৌঁছে। ছুরি নিয়ে উত্তমকে তাড়া করার ঘটনার পর থেকে স্বামী দিবানাথের সঙ্গে আরও দূরত্ব তৈরি হলো সুচিত্রা সেনের। দিবানাথ ছিলেন সুচিত্রা সিনেমা করুক, কিন্তু উত্তম কুমারকে ছাড়া। কিন্তু সুচিত্রা রাজি হলেন না কোনোমতেই। শেষ পর্যন্ত চরম সিদ্ধান্ত নিলেন সুচিত্রা। স্বামী, বালিগঞ্জের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরে। আলাদা থাকতে শুরু করলেন। এর কিছু দূরেই উত্তম কুমারের নতুন বাড়ি। সপরিবারে থাকবেন বলে বাড়িটি মনের মতো তৈরি করেছিলেন উত্তম।
ফিল্ম জগতে দুজনকে নিয়ে গুজব চরমে উঠল। এবার তাহলে উত্তম সুচিত্রাকে বিয়ে করবেন। দিবানাথকে ডিভোর্স এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা। উত্তমের সঙ্গে ঘর বাঁধবেন সুচিত্রা। গুজবের আঁচ থেকে রেহাই পাননি উত্তমও। তিনি রাত করে শুটিং থেকে ফিরলেই স্ত্রী গৌরিদেবীর মনে হতো বোধহয় সুচিত্রার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ফিরল। কেউ কেউ বলতে শুরু করলেন উত্তম-সুচিত্রার গোপনে বিয়ে হয়ে গেছে। সুচিত্রার ডিভোর্স হলেই ঘটা করে তা ঘোষণা করা হবে। এতে সুচিত্রা-দিবানাথের মতো দূরত্ব তৈরি হয় উত্তম- গৌরিদেবীর সম্পর্কেও। তবে উত্তম-সুচিত্রা সত্যিই বিয়ে করেছিলেন কি-না তা আজও রহস্যই রয়ে গেছে।
বিশেষ সংবাদদাতা
নকশাল হামলা থেকে ‘মবিং’ । এমনকি উত্তমকুমারের বিবাহ-প্রস্তাব । পরিস্থিতি যতই দূরূহ হোক, সুচিত্রা সেন সামলে দিতেন অবলীলায় । মহানায়িকার সেই দাপট দিনের পর দিন খুব কাছ থেকে দেখেছেন অমল শূর । অসিত সেনের সঙ্গে পাঁচটা ছবিতে (‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘আলো আমার আলো’, ‘মমতা’ (হিন্দী), ‘কমললতা’, ‘মেঘ কালো’) অ্যাসিস্ট করতে গিয়েই আলাপ । গত শুক্রবারের দুঃখী দুপুরে সেই সব না-বলা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন শতরূপা বসু-র সামনে’আমায় যেন চিতায় দাহ করা হয় । চুল্লিতে আমি যাব না । আমি ধোঁয়া হয়ে আকাশে উড়ে যাব, ছাই হয়ে মাটিতে মিশে যাব,’ এটাই শেষ ইচ্ছে ছিল সুচিত্রা সেনের । আমরা ভেবেছিলাম বেলুড় মঠে হবে শেষকৃত্য । যাক গে…১৯৬২ থেকে ম্যাডামের সঙ্গে আমার পরিচয় (ওঁকে এই নামেই ডাকতাম আমি) ।
আপনাদের বিপ্লব কি সুচিত্রা সেন-কে নিয়ে?
‘আলো আমার আলো’র শ্যুটিংয়ের একটা ঘটনা । তখন নকশাল আমল । এনটি ওয়ান থিয়েটার্সে চলছিল শ্যুট । নিজের মেক-আপ রুমে বসে তৈরি হচ্ছিলেন ম্যাডাম । হাতে ‘আলো আমার আলো’র চিত্রনাট্য । ম্যাডাম কোনওদিনই সংলাপ মুখস্ত বলতেন না । চিত্রনাট্যটা পড়তেন ভালো করে । একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল ওঁর রিয়্যাকশন । সেটাই করছিলেন । এমন সময়, ওঁর ঘরে ঢুকে পড়ে তিনটি ছেলে । সেই সময় যারা নকশাল করত তাদের অনেককেই আমরা চিনতাম । তাদের মধ্যে প্রধান ছিল রঞ্জিত নামে একটি ছেলে । হঠাত্‍ কানে এল, চিল চিত্কা র- ‘গেট আউট, গেট আউট!’ হুড়মুড়িয়ে এসে দেখি ম্যাডাম চিত্কাার করে ছেলেগুলিকে বকছেন । ‘কোন সাহসে আপনারা আমার ঘরে পারমিশান ছাড়া ঢুকেছেন?’ ছেলেগুলোও তেমনি, কিছুতেই যাবে না । অবশেষে, ‘বেশ করেছি… দেখে নেব,’ বলে-টলে চলে গেল । স্টুডিয়োর গেট বন্ধ করে দেওয়া হল । স্টুডিয়ো মালিককে বলে লালবাজারে পুলিশে খবর দিয়ে ম্যাডাম নিজের প্রটেকশনের ব্যবস্থা নিজেই করলেন ।
সেদিনের শ্যুটিং শেষ হল । ততক্ষণে প্রায় ৫০০ ছেলে জড়ো হয়েছে গেটের বাইরে । গেটের ভেতরে ম্যাডামের গাড়ি দাঁড়িয়ে । ড্রাইভার ছিল না । উনি গিয়ে হর্নটা চেপে ধরলেন । ঝাঁ-ঝাঁ হর্ন বাজছে । ড্রাইভার দৌড়ে এল । ম্যাডাম সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে, আমি পিছনে । তারপর, সবাই বারণ করা সত্ত্বেও, গেট খোলার নির্দেশ দিলেন । ৫০০ ছেলে হামলে পড়ল গাড়ির উপর । উনি আস্তে আস্তে গাড়ির কাচ নামালেন । তারপর দরজা খুললেন । সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘আপনি আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন । আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে ।’
ম্যাডাম আরও কঠিন হয়ে গেলেন । বললেন, ‘কে আপনারা ? স্টুডিয়ো আমার প্রফেশনাল জায়গা । আমার পারমিশন না নিয়ে ঢুকেছিলেন বলেই আমি আপনাদের বারণ করি । ক্ষমা তো আমি চাইব না । আপনারা বলুন কি চান ?’ ওরা বলল, ‘আমরা বিপ্লবী’ । ম্যাডাম বললেন, ‘আপনাদের বিপ্লব কি সুচিত্রা সেন-কে নিয়ে ? যদি আপনাদের কোনও সাহায্য লাগে আমি করতে পারি । কিন্ত্ত ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই নেই । আমি এখানে গাড়িতে বসে রইলাম । আপনাদের যা খুশি করতে পারেন ।’
এর পর, ছেলেরা ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে যায় । শেষ পর্যন্ত ওদের নেতা বলে, ‘দিদি আমাদের ক্ষমা করবেন ।’ মনে হল যেন ৫০০টা ছেলে একেবারে কেঁচো হয়ে গেল । এমনই সাহস আর ব্যক্তিত্ব ছিল ম্যাডামের । নিজে ঝামেলার মুখোমুখি হতেন । আর কারও, এমনকি উত্তমকুমারেরও এরকম পাবলিক হ্যান্ডেল করবার সাহস আর ক্ষমতা দেখিনি ।
আরেকবার, অষ্টমীর দিন সন্ধেবেলা, আমরা গাড়ি করে বেরিয়েছি । ব্রাবোর্ন রোড থেকে লিটন স্ট্রিট-এর দিকে যাচ্ছি । ভিড়ের জন্য গাড়ি এগোচ্ছে খুব ধীরে । এমন সময় একটি মেয়ে, সেও খুবই সুন্দরী, দূর থেকে ম্যাডামকে দেখে । চোখাচোখি হয় দু’জনের । অন্য ফ্যানেদের মতো মেয়েটি কিন্ত্ত দৌড়ে না এসে ম্যাডামকে একটা ফ্লাইয়িং কিস ছুঁড়ে দেয় । উত্তরে ম্যাডাম হাত মুঠো করে সেটি নিয়ে, নিজের সারা মুখে মেখে, ওর দিকে পাল্টা কিস ছুঁড়ে দেন । এমনই ছিল তাঁর মেজাজ । মেয়েটি যে তাঁর দিকে ছুটে আসেনি সেটা খুব পছন্দ হয়েছিল ম্যাডামের । গাড়ি ছেড়ে দেয় ।
একবার উত্তম কুমার ‘সন্ন্যাসী রাজা’র প্রজোযক অসীম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন । লোক জমায়েত হওয়ার ফলে ঝামেলার সম্মুখিন হন । তারপর পুলিশ আসাতে সে যাত্রায় বেঁচে যান । ম্যাডামের মতো নিজে ঝামেলার মুখোমুখি কিন্ত্ত হননি ।
নকশাল পিরিয়ডে, ঝামেলার জন্য প্রায়ই ম্যাডামের বাড়ির গেস্ট -রুমে থেকে যেতাম । ম্যাডামই বাড়ি ফিরতে বারণ করতেন । বিশাল বাড়ি । একটা পূর্ণ্য দৈর্ঘের টেনিস লন ছিল সেখানে । পোর্টিকো পেরিয়ে, বিরাট লিভিং রুম, ‘এল’-শেপের শ্বেতপাথরের বারান্দা পেরিয়ে ওঁর ঘর । মাঝখানে মুনমুনের ঘর । আর একেবার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে গেস্ট-রুম । আমি একবার বলেছিলাম, ‘আমি আপনার থেকে অনেক ছোট । আমাকে ‘আপনি’ বলেন কেন?’ বলেছিলেন, ”তুই’ আমার অন্তরে । বাইরে, ‘আপনি’ । আমি যদি সর্বসমক্ষে ‘তুই’ করে বলি তাহলে লোকে আপনাকে আমার চামচা বলবে । সম্মান করবে না । তাই, ‘আপনি’ই থাক ।’
বাড়িতে জাপানি কাফতান পরতেন । একবার ওঁর বাড়িতে থেকে গিয়েছি । আমাকে একটা কড়কড়ে নতুন শাড়ি দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, ‘এটা পরে শুয়ে পড়ুন । আমাকেই পাওয়া হবে ।’ আজ এই কথাগুলো বলতে বলতে গলা বুজে আসছে । সবার একটা ধারণা ছিল, সারাদিন সুচিত্রা সেন পুজোর ঘরে কাটাতেন । এটার কারণটা কী জানেন ? ওঁর পুজোর ঘরে একটা বড় কাঠের সিংহাসন ছিল । তার ওপর প্রচুর বিগ্রহ । রূপোর রাধা-কৃষ্ণ থেকে শুরু করে আরও অনেক । এই সিংহাসন রোজ ফুল দিয়ে সাজাতেই ওঁর প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগত । এটা করতে গিয়েই আসলে সময়টা যেত ।
উত্তম কুমারের সঙ্গে ওঁর কোনও রোম্যান্টিক সর্ম্পক ছিল না । বলেছিলেন, ‘আমি উত্তমের গলা ধরে ঝুলতে পারি । তাতে আমার বা উত্তমেরও কোনও ‘সেনসেশন’ হবে না । যেটা আমার ক্ষেত্রে অন্য পুরুষের সঙ্গে হতে পারে ।’
একবার একটা ঘটনা দেখেছিলাম । ম্যাডামের বাড়ি ঢুকছি, দেখি উত্তম ম্লানমুখে বসে আছেন । চলে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলেছিলেন, কোনও এক সমস্যা নিয়ে উত্তম এসেছিলেন তাঁর কাছে । কী সমস্যা সেটা অবশ্য ম্যাডাম আমাকে বলেননি । তবে, উত্তম নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমাদের বিয়ে হলে কেমন হত?’ ম্যাডাম তার উত্তরে বলেছিলেন, ‘একদিনও সেই বিয়ে টিঁকত না । তোমার আর আমার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত স্বতন্ত্র । আর খুব স্ট্রং । সেখানে সংঘাত হতই । তার ওপর, তুমি চাইবে তোমার সাফল্য, আমি চাইব আমার । এ রকম দু’জন বিয়ে করলে সে বিয়ে খুব বাজেভাবে ভেঙে যেত ।’
শাসনও করতেন উত্তমকে । উত্তমকুমারের একটা ভয়-মিশ্রিত শ্রদ্ধা ছিল ম্যাডামের প্রতি । বলতেন, ‘তোমার কোনও বেচাল দেখলে কিন্ত্ত আমি বলব ।’ বেণুদির (সুপ্রিয়া দেবী) সঙ্গে বিয়েতে যে আপত্তি করেছিলেন তা নয় । তবে উত্তমকুমারের মা আর স্ত্রী গৌরীদেবীকে নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলেন । কিন্ত্ত, নিজের সঙ্গে উত্তমের সম্পর্ক নষ্ট হতে দেননি কোনওদিন ।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশ আর ষাট দশককে বাঙলা রোম্যাণ্টিক সিনেমার স্বর্ণযুগে পৌঁছে দিয়েছিল একটি সুবিখ্যাত জুটি - সুচিত্রা সেন (রমা দাশগুপ্ত, জন্ম: ১৯৩১) এবং উত্তম কুমার (অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯২৬ - ৮০)। এই দুর্ধর্ষ জুটির প্রাধান্য এবং জনপ্রিয়তার মূলে ছিলো দুজনের সুন্দর চেহারা, নাট্য-ক্ষমতা এবং ভারতীয় (বিশেষ করে বাঙালী) দর্শকদের 'যেমনটি চাই তেমনটি' পুরুষ ও নারীর চরিত্র-চিত্রণ। সেই চরিত্র দুটি হল সুকুমার কৌমার্যের প্রতীক সত্যপরায়ণ আদর্শ পুরুষ এবং অতি-আদর্শবাদী, সহ্যশীলা, দয়ালু, স্নেহময়ী মাতৃসমা নারী যে জীবনের মূল্য খুঁজে পায় কোনও বীর যুবকের স্ত্রী, মা বা তার উপদেষ্টার ভূমিকায়। অন্যভাবে বলতে গেলে, নীতি-পরায়ণ এবং সর্বদা আত্মোত্সর্গ করতে বা ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত নারীর চরিত্রে অভিনয় করে সুচিত্রা জনপ্রিয় করে তোলেন হিন্দুনারীত্বের সারসত্যকে। উত্তমের চরিত্র যেন কঠোর-তপস্বী এমনিতে সংযত, কর্তব্যপরায়ণ, কিন্তু পৌরাণিক শিবের মত আদিম যৌনপুংগব ।
একদা হলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক বিলি ওয়াইল্ডার রোমান হলিডে-র (১৯৫৩) নায়িকা অড্রে হেপবার্ন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন যে, বিধাতা ওকে সৃষ্টি করে ওর দুই কপোলে চুম্বন করেছিলেন। এই প্রশস্তিটা রূপসী সুচিত্রারও প্রাপ্য। সুচিত্রা সেনের জয়যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৩ সালে সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পাবার পর থেকে। অভিনয়-জীবনে তিনি লক্ষ লক্ষ পুরুষের হৃদয়হরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে আমাদের দেশে, বিশেষ করে বাংলার মাটিতে যা হয় - তাঁর জীবনীকারেরা, যেমন সাংবাদিক গোপালকৃষ্ণ রায় (সুচিত্রার কথা) পূর্ব-বাংলার (অধুনা বাংলাদেশ) পাবনার এই চিরন্তন নারীকে (femina perennis) প্রায় পুজোর আসনে বসিয়েছেন।
সোমা চ্যাটার্জীর মার্জিত, কিন্তু অতিকথন দুষ্ট সুচিত্রা-জীবনীতে সুচিত্রার স্বর্গীয় (etheral) ও আলোকোজ্জ্বল (incandescent) সৌন্দর্য, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, দরদী হৃদয় এবং সর্বোপরি নিগুঢ় আধ্যাত্মিকতার বর্ণনা - নিতান্তই হাস্যকর উচ্চ-প্রশংসা। স্তুদিবাদ ও মামুলি উক্তির আধিক্যে ঘোমটার আড়ালে গ্রাম-বাংলার নব-বিবাহিত কনেবৌয়ের মত আসল রমাই ঢাকা পড়ে গেছে।
কলকাতার চলচ্চিত্রজগতে সুচিত্রা সেনের আত্মপ্রকাশকে বিচার করতে হবে উত্তর-স্বাধীনতা কালে ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতির নিরিখে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত অভিবাসি ও উদ্বাস্তুর তুমুল স্রোতে শহুরে ভদ্রলোক সমাজে পাশ্চাত্ব মনোভাব তেমন করে দানা বাঁধতে পারে নি; বাঙালীদের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ তখনও পুরুষ-দমিত গোষ্ঠীতন্ত্রের ঐতিহ্যকে আঁকরে ধরে রেখেছে। ফলত, আদর্শ নারীর গুণাবলী অপরিবর্তীত রয়ে গেছে পুরুষ-শাসিত সমাজের ব্যবস্থা মত - সহনশীলতা, আত্মোত্সর্গ এবং আত্মত্যাগের নিগড়ে। সৌভাগ্যক্রমে সুচিত্রার পরিচালকেরা, যেমন অগ্রদূত (বিভূতি লাহা, ও সহযোগী), যাত্রিক, অজয় কর, নির্মল দে, প্রভৃতি এই আদর্শ নারীর চরিত্রেই সুচিত্রা সেনকে উপস্থাপন করলেন। যে ছবিটি সুচিত্রা সেনকে সাধারণের কাছে প্রসিদ্ধি আনলো, সেটা হল অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)। ছবিটি চিরাচরিত নারীবিদ্বেষী গল্পর উপর ভিত্তি করে - যেখানে স্বামীকে অর্পণ করা হল সবরকমের সুযোগ-সুবিধা; রামায়ণের রামের মত তাঁকে দেওয়া হল হারানো স্ত্রীকে নানান কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবার অধিকার। এই ভাবেই শুরু হল সুচিত্রা সেনের ফিল্ম-ব্যক্তিত্ব, যেটি পরে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে।
১৯৫৬ সালে একটি রাত ছবিতে সুচিত্রা অভিনয় করলেন একটি সরলমতী ফ্লার্ট সান্ত্বনার ভূমিকায়। ভাগ্যচক্রে সান্ত্বনা তাঁর পূর্বপরিচিত সুশোভনের সঙ্গে গ্রামের এক পান্থনিবাসে রাত কাটাতে বাধ্য হলেন। সেখানে সান্ত্বনা মাঝেমধ্যে সুশোভনকে প্রেম-প্রেম ভাবভঙ্গী দেখালেও সুশোভন যখন ঘরের একটা মাত্র বিছানায় শোবার প্রস্তাব দিলেন, সান্ত্বনা সজোরে জানালেন ওটা অন্যায়, --- 'এটা ওদেশ নয়, এটা বাংলাদেশ।' বলাবাহুল্য সুচিত্রার বেশীর ভাগ পছন্দসই চরিত্রই যৌন-অনুভূতি প্রকাশে অপারগ ধর্মধ্বজী নারীর।
উত্তম কুমার যে সময়ে মহানায়ক হন, সে সময়ে তাঁর প্রতি জনসাধারণের আকর্ষণের বড় কারণ ছিলো লোকের চোখে তিনি আদর্শ শহুরে ভদ্রলোক । যেসব ছবিতে উনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতেন, চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকদের প্রসাদে সেই চরিত্রগুলি ছিলো আদর্শবান পুরুষের, যাঁরা নারীর আকর্ষণে বিচলিত হন না, কিন্তু নায়িকাদের উপর শিশুর মত নির্ভরশীল। এটি বিশেষকরে সত্য ৫০ ও ৬০ দশকে - সুচিত্রা সেন নায়িকা হলে।
অগ্নিপরীক্ষা ( ১৯৫৪), শাপমোচন (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), পথে হোল দেরি (১৯৫৭), হারানো সুর (১৯৫৭) রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), সপ্তপদী (১৯৬১), বিপাশা ৯১৯৬২), গৃহদাহ (১৯৬৭), হার মানা হার (১৯৭১), নবরাগ (১৯৭১), আলো আমার আলো (১৯৭২) এবং প্রিয় বান্ধবী (১৯৭৫) ছবিগুলিতে উত্তমকুমারের রোম্যাণ্টিক আবেদনের মূলে রয়েছ একটি অবিবাহিত রক্ষণশীল পুরুষ (আলো আমার আলো এর ব্যতিক্রম), যিনি যৌন ব্যাপারে উদাসীন - অর্থাৎ , নিরীহ বাঙালী হিন্দু আদম (Adam)। এই ধরণের চরিত্রের যেটা প্রয়োজন, সেটা হল তাকে দেখভাল করা, অসুস্থ হলে সেবা দিয়ে সুস্থ করা, এবং পরিশেষে ধীরে ধীরে সূক্ষ্মভাবে প্রিয়ার নজরে আনা। উত্তমের এই চরিত্রের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের মুখের মর্মস্পর্শী ভাব, নিখুঁত সৌন্দর্যের ডালা এবং ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে সৃষ্টি হল রোম্যাণ্টিক জুটির ম্যাজিক-মশলা - যা উদ্বেল করল সেই সময়ের (ঔপনিবেশিকোত্তর) বাংলা তথা ভারতীয় হৃদয়কে।
সুচিত্রা-উত্তম জুটির প্রধান বিশেষত্ব হল ওঁদের পরস্পরের কথোপকথনের ধারা। এটাকে আমি বলি 'রোম্যান্স অন এ টি-পট'। এখানে চা হল প্রেমের তরল ওষধি - যেটিকে আরও মধুরতর করা হয় যখন প্রথমজন বলেন 'আর চিনি লাগবে কি?' অথবা 'চিনি যথেষ্ট হয়েছে তো?' আরেকটা পরিচিত দৃশ্য হল, মধ্যরাতে নায়কের বেডরুমে নায়িকার আগমন এবং নায়িকার এই অসংগত আচরণে রুষ্ট হয়ে নায়কের ক্রোধপ্রকাশ। সম্ভবতঃ এই ধরণের দৃশ্য প্রথম দেখা যায় প্রমথেশ বড়ুয়ার (১৯০৩-৫১) দেবদাস ছবিতে। কলকাতার শিক্ষিত বাঙালী বাবুর নিজের পুরুষত্ব সম্পর্কে ভীতি মূর্ত হয়ে ওঠে যখন ছেলেবেলার সাথি পার্বতী গভীর রাত্রে ঘরে এসে হানা দেয় প্রেমিকের কাছে ধরা দিতে। প্রেমিকার এই আত্মসমর্পণে হতবুদ্ধি নপুংসকের প্রত্যুত্তর হল মেয়েটির মাথায় ছিপের বাড়ি মারা ! পার্বতীর কপালে রক্তের ধারাকে দেখানো হল মাথার সিঁদূরের প্রতীক হিসেবে।
উত্তমকুমারের রূপালী পর্দার চরিত্র নারীদের প্রতি পুরুষদের এই ধরণের আচরণের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। ওঁর বেশীর ভাগ রোম্যাণ্টিক ছবিতে দেখা যায় নারীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণের প্রতি নিস্পৃহতা এবং প্রেমের কোনও প্রস্তাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বিরূপভাব প্রদর্শন। ওঁর এই প্রায়-নারীবিদ্বেষী আচরণ, অতি-ন্যায়বান, অতি-রক্ষণশীল চরিত্রের জন্যেই উনি টলিউডের একজন অসাধারণ জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন, কারণ এগুলোই আদর্শ বাঙালী ভদ্রলোকের চরিত্রগুণ বলে ধরে নেওয়া হয়। অন্যপক্ষে, উত্তমকুমার বলিউডের নায়ক-চরিত্রে, যেখানে পুরুষসিংহ নায়ক নেচে গেয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন নি।
বাস্তবে বাংলা ছবিতেও যেখানে নায়ক সতেজ সাহসী মিশুকে প্রেমিক পুরুষ, নিজের পুরুষত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে প্রেম নিবেদন করতে দ্বিধাগ্রস্ত নন - সেইসব চরিত্রে ওঁকে মানাতো না। উনি চিরস্মরণীয় ওঁর চিত্তাকর্ষক চেহারা, মৃদুমন্দ্র স্বর, বাংলা কথা বলার ধরণ ও নিখুঁত উচ্চারণ জন্যে - যদিও ওঁর ইংরেজি উচ্চারণ দুষ্ট ও প্রায়শই হাস্যকর (জয়জয়ন্তী, ১৯৭১, আলো আমার আলো, নবরাগ)। মাঝ চল্লিশ থেকে ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত উত্তমের উচ্চারণ তার সুস্পষ্টতা হারাতে থাকে (গুজব উনি মদ্যপানে আসক্ত হয়েছিলেন - হয়তো সেই কারণে), ওঁর শরীরটাও আর টানটান ছিলো না এবং পরচুলা যে পড়তেন সেটাও বোঝা যেতো। উনি তখন অভিনয় করতেন হালকা হৃদয়ের বয়স্ক পুরুষের ভূমিকায় (ধন্যি মেয়ে, ১৯৭১, জয় জয়ন্তী, মৌচাক, ১৯৭৫), অথবা ভিলেনের চরিত্রে (বাঘবন্দি খেলা, ১৯৭৫, স্ত্রী, ১৯৭২, আলো আমার আলো, রাজা সাহেব, ১৯৮০), কিংবা আত্মঘাতি বিশ্বপ্রেমী (অগ্নিশ্বর, ১৯৭৫) হিসেবে।
সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয় করে যে অসামান্য সাফল্য উত্তম পেয়েছিলেন, সেইরকম সাফল্য অন্য কোনও নায়িকার সঙ্গে পান নি। অন্য সুন্দরী ও প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী, যেমন, সুপ্রিয়া চৌধুরী (পূর্ব-পদবী মুখার্জী) বা অপর্ণা সেনের (পূর্ব-পদবী দাশগুপ্ত) বিপরীত রোলও ওঁকে তেমন সাফল্য দিতে পারে নি। সুচিত্রা সেনই উত্তমকে ম্যাটিনি আইডল করে তুলেছিলেন। সুচিত্রা না থাকলেও উত্তম কুমার নিশ্চয় সুদক্ষ অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতেন - যদিও অভিনয়জীবনের প্রথমে এক পরিচালক ওঁকে ফ্লপ মাস্টার জেনারেল নাম দিয়েছিলেন। রূপলী পর্দায় সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধেই উনি বাংলা সিনেমার সোনার ছেলে হয়ে ওঠার সুযোগ পান।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ