eibela24.com
বুধবার, ২১, নভেম্বর, ২০১৮
 

 
টেগোর ক্যাসলের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ১৮৬তম জন্ম দিন আজ
আপডেট: ০৫:৪১ pm ১৬-০৫-২০১৭
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

বঙ্গ নাট্যালয় এবং টেগোর ক্যাসলের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর (জন্মঃ- ১৬ মে, ১৮৩১ - মৃত্যুঃ- ১০ জানুয়ারি, ১৯০৮ )

কলকাতা নাট্যশালা উন্নয়নে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি ১৮৬৫ সালে পাথুরিয়াঘাটায় বঙ্গ নাট্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি পরিচিত। তাছাড়া তিনি অনেক সঙ্গীতশিল্পীর ওস্তাদ ছিলেন। ভারতীয় সঙ্গীতে অর্কেস্ট্রাকে পরিচিত করে তুলতে তিনি ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীকে পৃষ্ঠপোষণ দান করেন। যতীন্দ্রমোহন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ‘রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’র প্রথম ভারতীয় সদস্য ছিলেন।

পরিবর্তনের ফলে হারিয়ে গেছে টেগোর ক্যাসলের আসল চেহারা
‘প্রাসাদ-নগরী’ কলকাতা জুড়ে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বহু নিদর্শন থাকলেও সঠিক অর্থে ‘প্রাসাদ’-এর সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়।সেই হাতে গোনা কয়েকটি প্রাসাদের অন্যতম ছিল পাথুরিয়াঘাটার ‘টেগোর ক্যাসল’। কিন্তু কালের প্রভাবে তার সেই প্রাসাদ-সৌন্দর্য আজ আর নেই বললেই চলে। পরিবর্তি হতে হতে এখন তা এক সাদামাটা অট্টালিকা মাত্র। প্রায় হাজার দশেক লোকের বসবাসপূর্ণ এই বাড়ি ঘন বসতি ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে এখন ম্যালেরিয়ার প্রসূতিঘরে পরিণত হয়েছে।
সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে জব চার্নকের কলকাতা আগমনের সমসাময়িক কালে যশোর থেকে পঞ্চানন কুশারী নামে ‘পিরালী থাক’ ভুক্ত এক সমাজচ্যুত ব্রাহ্মণ ভাগ্যান্বষণে কলকাতার সুতানুটি-পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে এসে ব্রিটিশ বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করেন। প্রতিবেশিদের কাছে ‘ঠাকুরমশাই’ অভিধায় সম্বোধিত হতে হতে এক সময়ে ‘ঠাকুর’ তাঁদের পদবিতেই পরিণত হয়। উচ্চারণ বিভ্রাটে সাহেবরা যাকে বলত ‘টেগোর’। এই টেগোর বা ঠাকুর পরিবার পরবর্তীকালে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়, যার জোড়াসাঁকো শাখার উত্তরপুরুষ দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ প্রমুখ।

ঠাকুরদের যে শাখাটি পাথুরিয়াঘাটাতেই বসবাস করতেন, তাঁদের অন্যতম উত্তরপুরুষ মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এই টেগোর ক্যাসল-এর রূপকার।
কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওই ক্যাসল কিন্তু হঠাত্‌ই তৈরি হয়নি। ওই জমিতে কালীকুমার ঠাকুর বৃহৎ ধনী পরিবারের বসবাসযোগ্য একটি বড় বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। ওই বাড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে হাতে আসে যতীন্দ্রমোহনের। তিনি সেটিকে প্রাসাদে রূপান্তরিত করেন। ১৮৯৫ সালে ‘ম্যাকিনটশ বার্ন’ কোম্পানিকে দিয়ে ইংল্যান্ড থেকে’ দুর্গের মত দেখতে এক প্রাসাদের নকশা করিয়ে আনেন। ওই বছর অক্টোবর মাস নাগাদ বাড়িটির পুনর্নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয়।

স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ড ক্যাসেলের অনুকরণে পুননির্মিত এই প্রাসাদের মধ্যস্থলে উইন্ডসর ক্যাসেলের আদলে একটি একশো ফুট উঁচু সেন্টার-টাওয়ার তৈরি করা হয়। বাড়ির প্রবেশপথে ক্লক-টাওয়ার নির্মাণ করে সেখানে বসানো হয় বিলেত থেকে আনা ঘড়ি। ওয়েস্টমিনস্টারের ‘বিগ বেন’ ঘড়ির তালেই নাকি তাল মেলাত টাওয়ারের ঘড়ি। তিন তলাতে ছিল অডিটোরিয়াম। নাটকপ্রেমী যতীন্দ্রমোহন সেখানে আয়োজন করতেন অনেক অভিনয়েরও।

যতীন্দ্রমোহনের সেই প্রাসাদ আজ স্থানীয় লোকের কাছে ‘মুন্দ্রা ক্যাসল’ নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালে ‘এস বি হাউজ এ্যান্ড ল্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এর পক্ষ থেকে জনৈক গোপাল মুন্দ্রা ৯১ বছরের জন্য লিজ নেন বাড়িটির। তারা ধাপে ধাপে পরিবর্তন ঘটান বাড়িটির। বাড়ির বড় বড় ঘরগুলি রূপান্তরিত হয়েছে ছোট ছোট ফ্ল্যাটে। প্রাসাদের বাইরের আদলও পরিবর্তিত হয়েছে নানা দিক থেকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরো বাড়িটিতে রয়েছে ৮৫০টির মতো ফ্ল্যাট, যেখানে বসবাস করেন প্রায় দশ হাজার বাসিন্দা। রয়েছে দুখানি স্কুলও। নির্বিচারে পরিবর্ত ঘটানোর ফলে বাড়ির আসল চেহারাটা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কালের প্রভাবে এভাবেই হারিয়ে গেছে উনিশ ও বিশ শতকের কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রাসাদ টেগোর কাসল।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ