eibela24.com
সোমবার, ২৪, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
এবারো তাদের ঈদ কাটল চোখের জলে
আপডেট: ০৬:২৭ am ২৯-০৬-২০১৭
 
 


গাজীপুর:: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও স্বজনদের কেউ না আসায় এবারো চোখের জলে ঈদের দিনটি কাটালেন গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাসরতদের অধিকাংশই। ঈদে এবার তারা কেন্দ্রের তরফ থেকে পেয়েছেন নতুন কাপড় আর ভালো খাবার। কিন্তু স্বজনরা না আসায় তাদের মনে কোনো আনন্দ ছিল না। কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এবারের ঈদে কেন্দ্রের ২১০ জন নিবাসীর মধ্যে ৩০ জন বৃদ্ধ এবং ৩২ জন বৃদ্ধা ১০ দিনের ছুটি নিয়ে তাদের স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে বাড়ি গেছেন। কিন্তু বাকি যারা ছিলেন তাদের মধ্যে মাত্র ৫-৬ জনের সঙ্গে স্বজনরা সাক্ষাত্ করে গেছেন। কেন্দ্রের বেশ কয়েকজন নিবাসী তাদের স্বজনদের নানা স্মৃতির কথা স্মরণ করে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। আবার কেউ কেউ চরম দুঃখ ও ক্ষোভে স্বজনদের কথা ও নামও উচ্চারণ করতে চাননি। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর বিকেবাড়ি এলাকায় অবস্থিত গিভেন্সী গ্রুপের পরিচালনাধীন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে বৃদ্ধ নিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এ সব করুণ কাহিনী জানা যায়।

এ কেন্দ্রের নিবাসী এসএম জামান (৭৩) জানান, এক সময় তিনি ঢাকা কোর্টের দলিল লেখক ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার চরকাঠালিয়া গ্রামে। তিনি ২০১৪ সালে অক্টোবর মাসে তার বড় ছেলে তাকে এই কেন্দ্রে রেখে গেছেন। তার ২ ছেলে ও এক মেয়ে। ২০০৪ সালে তার স্ত্রী মারা যান। তার ছেলেরা বেকার। ঘর ভাড়া নিয়ে তারা থাকেন। বাবার ভরণ পোষণ করার সঙ্গতি নেই তাদের। এ জন্য তার ছেলে তাকে এখানে রেখে গেছেন। তার বড় আশা ছিল অন্তত ঈদের দিন ছেলেরা তাকে দেখতে আসবে। কিন্তু তার সে আশা পূরণ হয়নি। এ জন্য এ বৃদ্ধের দুঃখের শেষ নেই।

প্রায় ১২ বছর পূর্বে এ কেন্দ্রে আসেন চাঁদপুরের মতলব থানার বাসিন্দা অশতিপর বৃদ্ধ আব্দুল সাত্তার (৮৫)। তিনি এক সময় সাইনবোর্ড তৈরির কারিগর ছিলেন। তত্কালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সাইনবোর্ডটি কোম্পানির পক্ষ থেকে তিনিই লাগিয়েছিলেন। তার তিন ছেলে, তিন মেয়ে। বড় ও মেজ ছেলে বর্তমানে বিদেশে আছে এবং ছোট ছেলে  মুন্সিগঞ্জের একটি হাসপাতালে চাকরি করেন। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে বসবাস করেন। তিনি জানান, এই পর্যন্ত স্বজনরা কেউ তার কোন খোঁজ-খবর নেয়নি। ঈদের দিন আশা করেছিলেন তার সন্তানরা এ দিনটিতে অন্তত তাকে দেখতে আসবেন। কিন্তু কেউ আসেনি। এ আক্ষেপ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

১৪ বছর পূর্বে এ কেন্দ্রে আসেন ভারতের মুর্শিদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ আহম্মদ আলীর স্ত্রী বেগম হোসনে আরা (৭৫)। তিনি ২০-২৫ বছর আগে তার স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং পরে ঢাকার বনানীর স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন ভাইয়ের সঙ্গে। পরবর্তীতে স্বামী, মেয়ে ও ভাই মারা যাওয়ার পর দেখাশোনার করার কেউ না থাকায় তার মেয়ের বান্ধবীর মাধ্যমে তিনি এ বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসেন। তিনি জানান, বর্তমানে তার অপর এক বড় ভাইয়ের ছেলে মেয়েরা ঢাকায় থাকেন কিন্তু কেউ খোঁজ-খবর নেয়নি। এমনিক ঈদেও কেউ তার সাথে দেখা করতে আসেনি।

রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার সাগরপাড়া গ্রামের মৃত নাজিম উদ্দিনের স্ত্রী ফিরোজা রহমান (৬৫)। তিনি ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অর্থনীতিতে অনার্স পাস করে ১৭ বছর তিনি ঢাকা অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার স্বামী বিয়ের ৯ মাস পর মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। ফিরোজা জানান, পারিবারিক কারণে ছেলের সাথে অভিমান করে একাই এ কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। বর্তমানে তার বৃদ্ধ মা, ভাই, বোন রয়েছে। কিন্তু কেউ তার খোঁজ-খবর নেয় না। আশা করেছিলেন এবার ঈদে কেউ হয়তো তার সাথে দেখা করতে আসবে, কিন্তু আসেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া মনিপুর এলাকার বিশিয়া-কুড়িবাড়ি মৌজায় ৭২ বিঘা জমিতে ১৯৯৪ সালে খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল পুনর্বাসন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫-২০ জন ষাটোর্ধ্ব অবহেলিত, উপার্জনে অক্ষম ও সহায় সম্বলহীন প্রবীণদের আশ্রয়, আন্ন, বস্ত্র ও  আমৃত্যু সার্বিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। এর আগে ১৯৮৭ সালে ঢাকার উত্তরায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে ছোট পরিসরে এর কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবু শরীফ জানান, কেন্দ্রটিতে এক হাজার লোকের পুনর্বাসনের সক্ষমতা রয়েছে। এই কেন্দ্রে বর্তমানে ১০০ জন বৃদ্ধ এবং ১১০ জন বৃদ্ধা রয়েছেন। এ কেন্দ্রের নিবাসীদের দেখাশোনার জন্য ৫৫ জন স্টাফ রয়েছে। এ ছাড়া এমবিবিএস চিকিত্সক, দুইজন প্যাথলজিকাল টেকনিশিয়ান, একজন ডিপ্লোমাধারী চিকিত্সক ও একজন নার্স নিবাসীদের চিকিত্সা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ