eibela24.com
শুক্রবার, ২১, সেপ্টেম্বর, ২০১৮
 

 
নওগাঁয় চোর সন্দেহে কিশোরকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন
আপডেট: ০৫:২৪ pm ২৮-০৮-২০১৭
 
 


নওগাঁর রাণীনগরে চোর সন্দেহে দু’দিন ধরে বাড়ীতে আটকে রেখে শরিফুল ইসলাম (১৪) নামের এক কিশোরকে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন করা হয়েছে। 

পা ধরে অনুনয় বিনয় ও বহু কান্নাকাটি করার পরও তাকে ছেড়ে দেয়া হয়নি। কিশোর শরিফুল ইসলামের বাড়ী নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কালিগ্রাম ইউনিয়নের কালিগ্রামের মুন্সিপাড়ায়। সে প্রবাসি জামাল উদ্দিন আকন্দের ছেলে। বর্তমানে শরিফুল নওগাঁ সদর হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে শিশু ওয়ার্ডের ৩৬ নং বেডে নির্যাতনের যন্ত্রনায় ছটফট করছে। ঘটনারদিন শুক্রবার রাতে থানার এক এসআই ঘটনাস্থলে গেলেও শরিফুলকে উদ্ধার না করে রহস্যজনক কারণে থানায় ফিরে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (২৫ আগষ্ট) দুপুরে শরিফুল ইসলাম বাড়িতে শুয়ে ছিল। প্রতিবেশী আব্দুল খালেক কাজ আছে বলে শরিফুলকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। শরিফুলকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর হাজী আক্কাস আলী, তার ছেলে জিয়ারুল ও টিপুকে বাড়িতে ডেকে নেয় খালেক। খালেক টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে শরিফুলের বাম হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এরপর গলায় গামছা পেচিয়ে ৪-৫ মিনিট ধরে টানা হেচড়া করে এবং শ্বাস রোধ করার চেষ্টা করে। শরিফুলের দুই ডানা পিঠ মোড়া দিয়ে পিছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে চারজন মিলে লাঠি দিয়ে নির্যাতন করে। চিৎকার চেঁচামেচি করায় কৌশলে শরিফুলকে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলের ধারে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে কয়েক দফা নির্যাতন চালানো হয়। প্রতিবেশিরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদেরকে মারপিট করার জন্য নিষেধ করে। এ বিষয়টি তার মা আয়েশাকে জানানো হলে ছুটে যান সেখানে। তাদের হাত পা ধরেও কোন কাজ হয়নি। এরপর থানা পুলিশে সংবাদ দেন মা আয়েশা। তখন রাত ৮টা। পুলিশের এসআই শফিকুর রহমান ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর শরিফুলকে উদ্ধার না করে রহস্যজনক ভাবে থানায় ফিরে আসেন। রাতে কিশোরকে খালেকের বাড়িতে রাখা হয় এবং আবারও নির্যাতন চালানো হয়। অবশেষে শনিবার রাতে ওসি মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে শরিফুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন।

নির্যাতনে শিকার শরিফুল বলে, কাজ করে নিবে বলে খালেক আমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে চারজন মিলে কয়েক দফা মারপিট করে। দুই পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ও পায়ের পাতায় সুঁচ ফুটিয়ে দেয় এবং দড়ি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে প্রায় ১৬ ঘন্টা ধরে লোহার রড় ও লাঠি দিয়ে মারপিট করেছে। ব্লেড দিয়ে পা কেটেছে। খালেক বলে তুই আমার ২০ হাজার টাকা কখনো বলে ৫০ হাজার এবং সোনাদানা চুরি করেছিস। তার টাকা কবে হারিয়েছে সেটাও আমি জানিনা বা চুরি করিনি।

শরিফুলের মা আয়েশা বলেন, চুরির অপবাদ দিয়ে শরিফুলকে বর্বর নির্যাতন করা হয়েছে। মারপিটের কারণে আমার ছেলে রক্ত বমি করেছে। দু’পায়ে ও শরীরে মারাত্মক জখম হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।

কালিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বাবলু বলেন, সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে শরিফুলের হাত বাধা অবস্থায় দেখি। তাদেরকে বলার পর তারা হাতের বাধন খুলে দেয়। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নি দেখা যাচ্ছিল। ছেলেটের চুরির অব্যাস আছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছে। আমি নিজে ডাক্তার নিয়ে এসে তার চিকিৎসা করিয়েছি। তবে শনিবার রাতে পুলিশ আবার গিয়ে ছেলেটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তবে ছেলেটি চুরি করেছে কিনা এ বিষয়টি জানা নেই।

মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোকাদ্দেস রাব্বানী জানান, মারপিটের কারনে শরিফুলের দু’হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্নস্থানে ফোলা ও রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন আছে।

থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) শফিকুর রহমান শফি বলেন, শুক্রবার রাতে আমি ঘটনাস্থলে যায়নি। ওই এলাকায় একজন আসামীকে আটক করতে গিয়েছিলাম। 

রাণীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত প্রধান আসামী গৃহকর্তাআব্দুল খালেককে আটক করা হয়েছে। ছেলের মা আয়েশা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আব্দুল খালেককে প্রধান আসামী করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিষয়টিতে অস্বীকার করে বলেন, বিষয়টি জানার পরই শনিবার রাতে ঘটনাস্থল থেকে শরিফুলকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছি।

এম/এসএম